টানা পাঁচ দিনের কালবৈশাখী ঝড় ও ভারী বর্ষণে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপকূলের প্রায় ৬৮ হাজার একর লবণ চাষ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এতে উৎপাদিত ও উৎপাদনাধীন প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন লবণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। হঠাৎ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে লবণ মাঠ লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, টানা বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ার কারণে মাঠে উৎপাদিত লবণ পানিতে গলে গেছে। পাশাপাশি উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা ‘বেড’ বা ‘কাই’ এবং পলিথিনও ব্যাপকভাবে নষ্ট হয়েছে। ফলে অনেক স্থানে লবণ উৎপাদন কার্যক্রম আপাতত বন্ধ রয়েছে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মাত্র ৬-৭ দিনের বৃষ্টিতেই প্রায় ৩ লাখ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদন কমে গেছে। তবে আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহ আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চাষিরা জানান, মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে তীব্র দাবদাহে উৎপাদন ভালো হচ্ছিল। দৈনিক উৎপাদন ১২ হাজার মেট্রিক টন থেকে বেড়ে একপর্যায়ে ৩২ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছায়। কিন্তু হঠাৎ কালবৈশাখীর তাণ্ডবে সেই ধারা থমকে যায়।
পেকুয়ার চাষি নুরুল ইসলাম, চকরিয়ার নাসির উদ্দিন ও ঈদগাঁওর সেলিম উল্লাহ বলেন, বর্গা ভিত্তিতে লবণ মাঠ নিয়ে তারা ১০ থেকে ১৬ কানি জমিতে চাষ করেছেন। মাত্র চার মাসের মাথায় ঝড় ও বৃষ্টিতে উৎপাদিত লবণ গলে যায়, পলিথিন উড়ে যায় এবং টানা ছয় দিন উৎপাদন বন্ধ থাকে। এতে খরচও ওঠেনি বলে জানান তারা।
চাষি সাইফুল ইসলাম বলেন, “প্রতিমণ লবণ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২৫০ টাকা। উৎপাদন খরচ যেখানে প্রতি কেজিতে ১০ টাকার বেশি, সেখানে বিক্রি করতে হচ্ছে ৫ টাকারও কম দামে। এতে আমরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।”
টেকনাফের আরেক চাষি মনজুর আলম জানান, লবণ মাঠে কয়েক লাখ মানুষ সরাসরি জড়িত। উৎপাদন বন্ধ থাকায় অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, যা উপকূলীয় পরিবারের জীবিকায় বড় প্রভাব ফেলছে।
কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া বলেন, “হঠাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কালবৈশাখীর তাণ্ডবে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এতে চাষিদের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লেগেছে। তবে সামনে কিছুদিন আবহাওয়া ভালো থাকলে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।”
চলতি মৌসুমে ২৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে উৎপাদন হয়েছে ১৭ লাখ ৫৯ হাজার মেট্রিক টন এবং আগের মৌসুমের ৪ লাখ মেট্রিক টন মজুত রয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বর্তমান বৈরী আবহাওয়া আগামী ৬ মে পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুনরায় উৎপাদন শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ১৪ মে থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ শুরু হয়ে ১০-১৫ দিন স্থায়ী হতে পারে, যা লবণ উৎপাদনে সহায়ক হবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।