গত কয়েকদিনে ভারি বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজার জেলার সদর উপজেলার কাউয়াদিঘি ও হাওরের অঞ্চলে হু হু করে বাড়ছে পানি। হাওড়ে চাষ করা বেঁচে থাকার সম্বল ধান বাঁচাতে কৃষকের যেন প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধে নেমেছেন।
হাওরাঞ্চলে বোরো ধান এখন শুধু ফসল নয় একটি ডুবে যাওয়া স্বপ্নের নাম। টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে জেলার বিস্তীর্ণ হাওর পানির নিচে তলিয়ে গেছে, আর সেই পানিতে পচে যাচ্ছে হাজারো কৃষকের বছরের একমাত্র আয়ের উৎস। সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্রধান কাটার আগেই জমি তলিয়ে যাওয়া, আর কেটে স্তুপ করে রাখা ধানও পচে নষ্ট হয়ে যাওয়া। কৃষকেরা বলছেন, এটি শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ব্যর্থতাও সমানভাবে দায়ী।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী মোট আবাদ: ৬২,৪০০ হেক্টও হাওর এলাকায়: ২৭,৩৫৫ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত: ৩,৫০০ হেক্টও সম্ভাব্য ক্ষতি: প্রায় ৪ ০থেকে ৫০ কোটি টাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সদর, রাজনগর, কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা ও শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওর।
তবে মাঠপর্যায়ের কৃষকেরা বলছেন, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে। মনু প্রকল্পের রাজনগরস্থ কাশিমপুর পাম্প হাউস কর্তৃপক্ষ নিয়ম মেনে হাওরের পানি সেচ দিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা।
সংগ্রহ কার্যক্রম অনিশ্চিত সারাদেশে ধান সংগ্রহ শুরু হলেও মৌলভীবাজারে এখনো তা শুরু হয়নি। বৈরী আবহাওয়া ও পানিতে নিমজ্জিত ফসলকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও এতে কৃষকের সংকট আরও গভীর হচ্ছে। চলতি বছর জেলায় ৬ হাজার ৪ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
কৃষাণী জবা রানীর ভেঙে পড়া স্বপ্ন মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাদিপুর গ্রামের কৃষাণী জবা রানী বিশ্বাসের স্বপ্ন ছিল ২৫ বিঘা জমির ধান বিক্রি করে ঋণ শোধ ও সংসারের হাল ধরা।
কিন্তু এখন সেই স্বপ্ন পানিতে ভাসছে। তিনি জানান, “দুই বিঘা জমির ধান তুলেছি, কিন্তু শুকাতে পারিনি। সব পচে গেছে, অনেক জায়গায় চারা উঠেছে। এখন পচা ধান সেদ্ধ করে খাচ্ছি।”
ঘরে খাদ্য নেই, বাজার থেকে কিনে খেতে হচ্ছে—আর সামনে পুরো বছর কীভাবে চলবে তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা।
শেওয়াইজুড়ী এলাকার কৃষক বাবর মিয়া বলেন, “পাম্প ঠিকমতো চললে জমি ডুবে থাকত না। এখন প্রতি বিঘায় ৪ হাজার টাকা খরচ করে পানির নিচ থেকে ধান তুলতে হচ্ছে।” যান্ত্রিক ব্যবস্থা অচল, শ্রমিক সংকট তীব্র হাওর এলাকায় শ্রমিক সংকট প্রকট।
মিরপুর এলাকার কৃষক জুনেদ মিয়া জানান, তার ১০ বিঘা জমির মধ্যে মাত্র ১ বিঘা ধান তুলতে পেরেছেন। বাকি জমি এক সপ্তাহ ধরে পানির নিচে। অধিকাংশ কৃষক বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন। এখন ফসল নষ্ট হওয়ায় তারা সেই ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
ক্ষতির পাশাপাশি বাজারে ধানের দামও পড়ে গেছে। মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ ৭৫০৯০০ টাকা থাকলেও এখন নেমে এসেছে ৫০০ টাকায়।
পানি উন্নয়ন বোর্ড, মৌলভীবাজার কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলিদ বলেন, মার্চের ১০ তারিখ থেকে মৌলভীবাজারে প্রায় ধারাবাহিকভাবে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এই বৃষ্টির কারণে হাওড় অঞ্চলে কিছু পানি জমেছে। আমরা ইতোমধ্যে আমাদের সুইচ গেটগুলো খুলে রেখেছি এবং পাম্প হাউসগুলো নিয়মিত চালু রয়েছে। বর্তমানে হাওড়ে যে পরিমাণ পানির স্তর থাকা প্রয়োজন, ঠিক সেই পরিমাণই রয়েছে। আমরা পাম্পগুলো ধারাবাহিকভাবে চালু রেখেছি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোঃ জালাল উদ্দিন জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নের কাজ মাঠপর্যায়ে চলমান রয়েছে এবং ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তালিকা প্রস্তুত করা সম্ভব হবে, কতজন কৃষক, কত হেক্টর জমি এবং কতটি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্ষাকাল চলমান থাকায় বৃষ্টিপাত হওয়া স্বাভাবিক বিষয়। তবে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ওপর নজর রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তুতি রয়েছে।