মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় অবিরাম বর্ষণে ও পাহাড়ি স্রোতে গোগালীছড়ার কুলাউড়া সদর ইউনিয়নের গাজিপুরে গোগালীছড়ায় প্রায় ১শ ৫০ ফুট বাঁধ ভাঙনের ফলে ১৫ টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে। এতে ফসল, মৎস্য খামার ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
জানা যায়, গত সোমবার রাতে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখীতে উপজেলার শমশেরনগর, পতনঊষার ও মুন্সিবাজার ইউনিয়নের প্রায় ৫০টি ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঝড়ে গাছগাছালি ভেঙে বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে করে উপজেলার মুন্সিবাজার এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রে অন্ধকারের মধ্যে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে হয়। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতরে গাছ ভেঙে পড়ায় সোমবার ভোর থেকে গতকাল মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত ভানুগাছ-শ্রীমঙ্গল সড়কপথ বন্ধ ছিল। শমশেরনগর বিমানবাহিনী ইউনিটের পাশে রেলপথে গাছ পড়ায় ঢাকাগামী কালনী এক্সেপ্রেস ট্রেন ৪০ মিনিট আটকে থাকে। এতে চরম ভোগান্তির শিকার হন হাজারো যাত্রী।
জেলার বিভিন্ন উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজনগর উপজেলার রাজনগর ইউনিয়নের পূর্ব নন্দীউড়া ও ভুজবল গ্রামে উদনা নদীসংলগ্ন এলাকাগুলোয় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সিবাজার, আদমপুর ও পতনঊষার ইউনিয়নে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে বেশ কিছু এলাকা তলিয়ে গেছে। সদর উপজেলার জগন্নাথপুর এলাকায় পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ি। একইভাবে কুলাউড়া ও বড়লেখা উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সব মিলিয়ে জেলায় পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
সদর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নাদিম মাহমুদ রাজু জানান, গাজিপুর গ্রামেই প্রায় ২০ বিঘা বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত রাম চন্দ্র পাল, জমির মিয়া, রবি দত্ত জানান, হাড়ভাঙা খাটুনি আর চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তারা এবার চাষাবাদ করেছিলেন। এখন ফসল হারিয়ে তারা নিঃস্ব। অনেক কৃষককে বুক সমান পানিতে নেমে আধা-পাকা ধান কাটার নিরর্থক চেষ্টা করতে দেখা গেছে।
পানিবন্দী কাওছার আহমেদ বলেন, ‘দুই দিন ধরে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। আজ সকালে আমাদের রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে। বাড়িতে পানি উঠে গেছে সকালে। বোরো ধান সব তলিয়ে গেছে। টানা তিন দিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। সব মিলিয়ে মহা কষ্টের মধ্যে আছি।’
শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, গতকাল সোমবার সকাল ৬টা থেকে আজ দুপুর পর্যন্ত জেলায় ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আগামী কয়েক দিন আরও বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, আজ সকালে ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে মনু, ধলাই, কুশিয়ারা ও জুড়ী নদ-নদীতে পানি বাড়ে। মনু ও ধলাই নদের ছয়টি প্রতিরক্ষা বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। ভারতে বা উজানে অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে বন্যা হতে পারে।
এ সময় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা প্লাবন পাল, কালাপুর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মতলিব উপস্থিত ছিলেন।
মৌলভীবাজার পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওয়ালিদ বলেন, ‘জেলার প্রধান চারটি নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আমরা পানি বৃদ্ধির পরিস্থিতি সব সময় খেয়াল রাখছি। তবে উজানে অতিবৃষ্টি হলে বন্যা হতে পারে।’
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাদু মিয়া বলেন, ‘আমরা সব উপজেলায় বলে দিয়েছি ক্ষতিগ্রস্ত ও পানিবন্দী মানুষের তালিকা করার জন্য। তবে জেলার বেশির ভাগ এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। আমরা চাল ও নগদ টাকা বরাদ্দের জন্য প্রস্তুত করছি।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, উপজেলার কালাপুর ইউনিয়নের আওতাধীন মাজডিহী চা বাগান এলাকায় ভারি বর্ষণে জলাবদ্ধতা তৈরি হলে কয়েকটি পরিবারকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চা বাগানস্থ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এবং ভুক্তভোগী ২০টি পরিবারের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া অতি বৃষ্টিতে শ্রীমঙ্গল উপজেলার মীরনগর এলাকায় শাওন ছড়ার বাধ ভেঙ্গে যাওয়ার খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে এই এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে এবং দ্রুতবাঁধ সংস্কার কাজ শুরু করা হচ্ছে।