জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার দেশের জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিতে যখন এ পদক্ষেপ নিচ্ছে তখন বাপেক্সকে আর অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।
জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম বলেন, ‘বিগত সরকারের গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম বিদেশি কোম্পানিগুলোকে দিয়ে করানোর প্রবণতা ছিল।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, বিগত স্বৈরাচারের সময় সরকারি প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে রীতিমতো পঙ্গু করে রাখা হয়েছিল। ফলে অপর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান বা আমদানিনির্ভরতার কারণে বর্তমানের জ্বালানিসংকট সৃষ্টি হয়।
তিনি জানান, বাপেক্সকে শক্তিশালী করতে আরো দুটি নতুন রিগ কেনার প্রক্রিয়া চলছে।
পুরোনো পাঁচ রিগ, কেনা হচ্ছে আরো দুটি : খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে বাপেক্সের রিগের সংখ্যা ৫। এগুলো হলো বিজয়-১০, বিজয়-১১, বিজয়-১২, বিজয়-১৮ ও আইডিএস-১। কিন্তু বাপেক্সের এ রিগুগুলোর কোনো সার্টিফিকেট নেই। রিগগুলো গড়ে ১০ থেকে ২৫ বছরের পুরোনো। বাধ্য হয়েই দেশে কূপ খননের কাজে পুরোনো রিগগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, দুটি আধুনিক অনুসন্ধান কূপ খনন রিগ কেনার প্রস্তাব এরই মধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার হর্সপাওয়ারের একটি রিগ কেনার মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চলছে। এর সঙ্গে ১ হাজার ৫০০ হর্সপাওয়ার ক্ষমতার আরেকটি রিগ কেনার জন্য একটি বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব প্রস্তুত করা হচ্ছে। এটি চূড়ান্ত হওয়ার পর অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে।
কম বেতন, মেধাবীদের আগ্রহ কম : যেখানে ভারতের ওএনজিসির কর্মীদের বেতন জাতীয় স্কেলের দ্বিগুণ, সেখানে বাংলাদেশের জাতীয় বেতন স্কেলের চেয়ে কম বেতন পান বাপেক্স কর্মীরা। স্বাভাবিক কারণে বাপেক্সে মেধাবীদের কাজের আগ্রহ কম। তারা বহুজাতিক তেল-গ্যাস কম্পানিতে উচ্চবেতনে চাকরি করার জন্য চলে যান।
প্রয়োজন দক্ষ জনবল : বিশেষজ্ঞদের মতে বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়াতে সংস্থাটিকে রিগ কিনে দেওয়ার কথা সব সময় আগে আসে। নতুন যে রিগ কেনার প্রক্রিয়া চলছে তার জন্য যে জনবল প্রয়োজন তা নেই। সক্ষমতা অর্জনের জন্য আগে দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাপেক্সের জনবলের যে প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট তা এ সংস্থার নেই। বাপেক্স যে ফিল্ডগুলো চালাচ্ছে, সেখানে সক্ষম টিম গঠন করতে হবে।
দেশের গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িতরা জানান, বাপেক্সের পাঁচটি রিগের মধ্যে দুটি ওয়ার্কওভার কাজের জন্য আর তিনটি ড্রিলিং রিগ। এ রিগগুলো চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল সংস্থায় নেই। অথচ ড্রিলিং সাইটে ২৪ ঘণ্টাই জনবল লাগে। বিদেশি কম্পানিগুলো বছরে সাত থেকে আটটি কূপ খনন করে। আর বাপেক্স দক্ষ জনবলের অভাবে বছরে মাত্র একটি কূপ খনন করে।
প্রয়োজন আধুনিক সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি : বাপেক্সের জিওলজিক্যাল ও জিওফিজিক্যাল বিভাগের অনুসন্ধান কার্যক্রম আরো আন্তর্জাতিক মানের করতে নতুন সফটওয়্যার ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বাপেক্সে যে থ্রিডি সিসমিক সার্ভে করা হয়, এর বিভিন্ন হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার আছে। এগুলো প্রতিনিয়ত আপডেট করতে হয়। এ ক্ষেত্রে সরকারের ক্রয়প্রক্রিয়ায় বিষয়টি বাপেক্সের জন্য ডেডিকেটেড করতে হবে। সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান করতে হলে বাপেক্সের জন্য থ্রিডি প্রযুক্তিসম্পন্ন জাহাজ প্রয়োজন। কিন্তু এ ধরনের জাহাজ বাপেক্সকে কিনে দেওয়া হচ্ছে না। বিগত সময়ে সরকার বাপেক্সকে নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে সহায়তা নেওয়ার কথা বলেছে।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পিছিয়ে বাপেক্স : বাপেক্স কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খননপ্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে প্রথমেই ডিপিপি বা উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়ন করতে হয়। এটি বাপেক্সের বোর্ডে ওঠে। বোর্ড অনুমোদন দিলে তারপর পেট্রোবাংলার বোর্ডে যায়। সেখানে অনুমোদন দিলে মন্ত্রণালয়ে যাবে। মন্ত্রণালয় থেকে অর্থের সংস্থান করতে হবে। তারপর পরিকল্পনা কমিশনে যাবে। সেখানে বেশ কিছু বৈঠকের পর একনেকে যাবে। একনেক অনুমোদন দিলে ডিপিপি আসবে, এরপর টেন্ডার হবে এবং কূপ খনন শুরু হবে।
এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে বছরে একটি কূপও খনন করা সম্ভব নয়। কিন্তু বাপেক্সের জন্য যদি আলাদা অর্থ বরাদ্দ থাকে, তাহলে বছরে তিনটি করে কূপ খনন করা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে ভূমি প্রস্তুত থাকলে কূপ খনন সহজ হয়। তা না হলে ভূমি অধিগ্রহণ করতে দুই বছর লাগবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাপেক্সের খনন বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বাপেক্সে সর্বোচ্চ দুটি রিগ চালানোর মতো জনবল আছে। এখন কিছু জনবল বাড়ানো হলেও এ ধরনের টেকনিক্যাল কাজে দক্ষতা এত দ্রুত অর্জন করা সম্ভব নয়। ন্যূনতম চার-পাঁচটি কূপে কাজ করার পর নতুনদের দক্ষতা তৈরি হবে।’
তিনি বলেন, ‘নতুন সরকার আসার পর বাপেক্সের উন্নয়নে উদ্যোগ নিয়েছে। মন্ত্রণালয় পর্যায় থেকে একটি কমিটি হয়েছে জনবল নিয়োগের জন্য। তবে ছয় মাসের মধ্যেই ফল মিলবে এমন নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এর ফল পেতে কমপক্ষে দেড়-দুই বছর লাগবে।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘বাপেক্সকে একটি আন্তর্জাতিক ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে এর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, কারিগরি দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার দরকার আছে। তবে এর উন্নয়নের কোনো কাজই বিগত সরকারগুলো করেনি।’
তিনি বলেন, ‘দ্রুত এ সংস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হলে বিশ্বব্যাপী মেধাবীদের খোঁজ করে উচ্চবেতনে নিয়োগ দিতে হবে। আন্তর্জাতিক কম্পানিগুলোর সঙ্গে কাজ করতে যে জ্ঞান দরকার তা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাপেক্সের কর্মকর্তাদের শিখতে হবে।’
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন