জীব-বৈচিত্রে সমৃদ্ধ লাউয়াছড়া বনের কালাছড়া ও চাউতলী সহ ৩টি বনবিটের পাহারার দ্বায়িত্বে থাকা ৪০ জন সিপিজি সদস্য ও ৮জন স্টাফের সমন্বয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাত-দিন পালাক্রমে দ্বায়িত্ব পালন করলেও কর্তৃপক্ষ অর্থ ছাড় না দেয়ায় ৫মাস যাবত ভাতা বন্ধ রয়েছে তাদের। বেতন-ভাতা বন্ধ থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন তারা।
দেশের সরকার ঘোষিত ১০টি জাতীয় উদ্যানের অন্যতম মৌলভীবাজার জেলার সীমান্তবর্তী কমলগঞ্জ উপজেলার ১২৫০ হেক্টর আয়তনের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। বিরল উদ্ভিদ আর বিচিত্র সব বণ্যপ্রাণী সমৃদ্ধ সবুজ এ অরণ্য দেখতে প্রতিদিন ছুটে আসেন দেশ-বিদেশের নানা প্রান্ত থেকে শতশত পর্যটক। হাজারও পর্যটকের নিরাপদ পদচারণা নিশ্চিত ও সমৃদ্ধ এই বিশাল বনের নিরাপত্তায় লাউয়াছড়া সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির অধিনে শ্রীমঙ্গল রেঞ্জের লাউয়াছড়া, কালাছড়া ও চাউতলী সহ ৩টি বনবিটে বিরামহীন দ্বায়িত্ব পালন করেন ৪০ জন কমিউনিটি পেট্রোলিং গ্রুপের (সিপিজি) সদস্যরা। এর মধ্যে ১০ জন রয়েছেন নারী সদস্য আর পুরুষ সদস্য রয়েছেন ৩০ জন। আর স্টাফ রয়েছেন ৮ জন। সবমিলিয়ে ৪৮ জনের জনবল গভীর এই অরণ্যে বণ্যপ্রাণী ও জীব-বৈচিত্র রক্ষায় পালাক্রমে দ্বায়িত্ব পালন করে আসছেন।
৫ মাসের ভাতা বন্ধ থাকায় মাসিক দোকান বাকিও পরিশোধ করতে পারছেন না। ফলে স্থানীয় বাজারের ব্যবসায়ীদের সাথে পাওনা টাকা পরিশোধ না করায় তৈরি হয়েছে দ্বন্দ্ব আর দূরত্ব। জানা গেছে, ২০২৪ সালে পটপরিবর্তনের আগেই শেষ হয় লাউয়াছড়া সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির মেয়াদ। বর্তমানে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির অধিনেই চলছেন স্টাফ ও সিপিজি সদস্যরা। কর্তৃপক্ষ কমিটির মেয়াদ না থাকার অজুহাতে ছাড় দিচ্ছেনা কাঙ্খিত অর্থ। ফলে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি আর কর্তৃপক্ষের দ্বন্দ্বে বলির পাঠা হচ্ছেন স্টাফ ও সিপিজি সদস্যরা। ভাতা বন্ধ থাকলেও বন রক্ষায় বু চিতিয়ে বিরামহীন দ্বায়িত্ব পালন করছেন তারা। তবুও মন গলছেনা কতৃপক্ষের। লাউয়াছড়া সহ ব্যবস্থাপনা কমিটি সূত্রে জানা গেছে সিপিজি সদস্যদের ৫ মাসে ১০ লক্ষ টাকারও বেশি পাওনা রয়েছে। ২৪ সালের পটপরিবর্তন পরবর্তী ২ বছর মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির অধিনে সিপিজি সদস্যরা ভাতা পেলেও বর্তমান কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ এমন অজুহাতে কতৃপক্ষ ছাড় দিচ্ছে না নিম্ন আয়ের এসব সদস্যদের ভাতার টাকা। ফলে অনাহারে বেশ কষ্টে কাটছে তাদের জীবন।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের সিপিজি সদস্যরা জানান, ৭ বছর যাবত লাউয়াছড়ায় দ্বায়িত্ব পালন করে আসছি। যে ভাতা পেতাম সেটা মাস শেষ হলেই পেয়ে যেতাম। বিগত ৫মাস ভাতা বন্ধ থাকায় আমাদের কষ্ট দিন কাটছে। দোকনে বাকি খেতে খেতে এখন দোকান মালিক বাকিও দিতে চায় না। বিষয়টি আমাদের ঊর্ধবতন কতৃপক্ষেরও জানা। আমরা দীর্ঘদিন যাবত এই বন ও বনের বণ্যপ্রাণীর দ্বায়িত্ব পালন করে আসছি। আমরা আগে এখানে শ্রম দিছি ফলে আমাদের ভাতাও সময়মতো পেয়ে যেতাম। এখন ৫মাস ধরে ভাতা বন্ধ থাকায় আমাদের খুবই কষ্ট হচ্ছে। তাদের মধ্যে কী দ্বন্দ্ব সেটাতো আমাদের দেখার বিষয় না। অনেক দোকানে খরচ বাকি আছে। লজ্জায় এসব দোকানের ধারে-কাছেও যেতে পারি না। দোকান মালিকরাও চাপ দিচ্ছে। ৬মাস যাবত আমাদের টহল ভাতা পাচ্ছিনা। সম্প্রতি দুর্গা পুজায়ও আমরা ভাতা পাইনি। আমরা জানি না কী কারণে ডিএফও স্যার আমাদের পাওনা টাকা দিচ্ছেন না। ডিএফও স্যার এর কাছে গেলে তিনি বলছেন কমিটি অবৈধ। কমিটি যদি অবৈধ হয় তাহলে সরকার পতনের দুই বছর পর্যন্ত কীভাবে তিনি ভাতার টাকা দিলেন?
বটতল বাজার ব্যবসারা বলেন, সিপিজি সদস্যদের বেতন-ভাতা হচ্ছেনা প্রায় ৫ থেকে ৬ মাস। তাদের মধ্যে ৬ জনের কাছে আমার পাওনা। এরা সবাই গরিব মানুষ। টাকা না পাওয়ায় আমার পাওনা টাকাও তারা দিচ্ছে না। আমার ছোট দোকান। তাদের বাকি দিতে গিয়ে আমার দোকান খালি হয়ে যাচ্ছে।
লাউয়াছড়ার সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আমেনা বেগম বলেন, প্রায় ৪২-৪৫ জন সিপিজি সদস্যের পাঁচ মাসের বেতন-ভাতা বকেয়া রয়েছে, যার পরিমাণ ১০ লাখ টাকারও বেশি। (ডিএফও) জানিয়েছেন, কমিটি পুনর্গঠন বা নতুন কমিটি গঠনের পর বকেয়া অর্থ ছাড় করা হবে। দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ায় আর্থিক সংকটে রয়েছেন সিপিজি সদস্যরা।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. আবুল কালাম,বলেন, “কিছু আটকাইতে পারি না। যা কিছু কার্যক্রম কো-ম্যানেজমেন্ট কমিটি বা সিএমসি করবে কেমন। নির্বাচিত যে কমিটি, সেই কমিটি করবে।”আমি রক্ষিত এলাকা ব্যবস্থাপনা বিধিমালা অনুসরণ করে তো করি, আমি ওইটা অনুসরণ করে করছি।