রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ জোরদার করতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতীয় ঐক্য ও আন্তর্জাতিক চাপ একসঙ্গে জরুরি।
রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে কার্যকর কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি, চীন-ভারতসহ সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে সম্পৃক্ত করা এবং জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার আহ্বান
রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান সামরিকভাবে সম্ভব নয়, এর সমাধান করতে হবে রাজনৈতিকভাবে এমন মন্তব্য করে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট ক্রমেই বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে। অনিশ্চিত সময়ের জন্য এই ঝুঁকি বহন করার কোনো সুযোগ বাংলাদেশের নেই। এ সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে মিয়ানমারের ওপর কার্যকর কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে।
আজ রোববার (৮ নভেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে নীতি গবেষণা কেন্দ্র আয়োজিত “রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে টেকসই পন্থা: জাতীয় কৌশলের রূপরেখা ও বৈদেশিক অবদান” শীর্ষক জাতীয় নীতি সংলাপে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
সাইফুল হক বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে দীর্ঘদিন শুধু মানবিক সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন বাংলাদেশের নিরাপত্তা, সীমান্ত, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সময় যত যাচ্ছে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি ততই বাড়ছে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের প্রশ্নটি এখন অত্যন্ত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে অতীতে বিভিন্ন সময়ে প্রত্যাবাসন নিয়ে আশাবাদ তৈরি করা হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। একের পর এক ঈদ চলে গেছে, কিন্তু রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। মিয়ানমারের বর্তমান উদ্যোগ যে গতিতে চলছে, তাতে প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নে অসহনীয় দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে।
রোহিঙ্গা সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই উল্লেখ করে সাইফুল হক বলেন, মিয়ানমারের বিভিন্ন সশস্ত্র পক্ষের মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে এক ধরনের নেতিবাচক বোঝাপড়া রয়েছে। তাই শুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ওপর নির্ভর করলে হবে না, সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আলোচনার আওতায় আনতে হবে।
তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে চীন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে চীনকে বাংলাদেশ আরও কার্যকরি ও উদ্যোগীয় ভূমিকায় দেখতে চায়। সাইফুল হক বলেন, চীন ও ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি এবং রাশিয়াসহ অন্যান্য প্রভাবশালী দেশকে সম্পৃক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে জাতিসংঘকে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশ, মিয়ানমার এবং রাখাইনের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে রাজনৈতিক বোঝাপড়া গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হলে এই বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত গণহত্যা ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের কার্যকর বিচারও প্রত্যাবাসনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। রোহিঙ্গারা যাতে ভবিষ্যতে নিরাপদে, মানবিক মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক-সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে নিজ দেশে বসবাস করতে পারে, সে নিশ্চয়তা দিতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকটকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করে সরকারকে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সাইফুল হক বলেন, “প্রতি আরেকটা ঝুঁকি আমাদের পক্ষে অনিশ্চিত সময়ের জন্য বহন করার কোনো সুযোগ নেই।” বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও নিরাপত্তার নানা ঝুঁকির সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটের মাত্রা ক্রমেই যুক্ত হচ্ছে। তাই এখন আর সময়ক্ষেপণের সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, মিয়ানমারের বিভিন্ন পক্ষের ওপর কার্যকর কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে হলে বাংলাদেশের ভেতরে একটি জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে একটি কমিটি গঠন অথবা জাতীয় কনভেনশনের মতো উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
সাইফুল হক বলেন, রোহিঙ্গা সংকট কোনো দলের একক বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার প্রশ্ন। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু এই ইস্যুতে বাংলাদেশকে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে হবে। সেই ঐক্যের বার্তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, মিয়ানমারের বিভিন্ন পক্ষ এবং বিশ্ব জনমতের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।
তিনি বলেন, সরকার যে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জাতীয় কমিটি গঠন করেছে, তাদের কাছ থেকে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ও গাইডলাইন আশা করা যায়। সেই উদ্যোগে রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের যুক্ত করা হলে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত ভূমিকা পালন করা সম্ভব হবে।
সংলাপে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, রোহিঙ্গা সংকট শুধু মানবিক সমস্যা নয়, এটি একটি রাজনৈতিক সমস্যা। সংকটের টেকসই সমাধান ও প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি রাখাইন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি আরাকান আর্মির সঙ্গেও বাংলাদেশ যোগাযোগ রাখছে। একই সঙ্গে চীন, ভারত ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ চলছে।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক, নীতি গবেষণা কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ড. শাকিল আহমেদসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও প্রতিনিধিরা।