ইসরাইলে গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটকে সমর্থনের ঘোষণা দিয়েছে আরব দলগুলোর জোট জয়েন্ট লিস্ট।
বৃহস্পতিবার জোটটি জানিয়েছে, তারা দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে আইজেনকটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করবে। এ সমর্থনের ফলে পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পথে এগিয়ে যাবেন আইজেনকট।
ইসরাইলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে গত সপ্তাহের নির্বাচনে রেকর্ড ১৯টি আসন পেয়েছে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো। ফলে নতুন সরকার গঠনে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জয়েন্ট লিস্ট জানায়, তারা ওই দিন সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে যে গাদি আইজেনকটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে তাদের সমর্থন রয়েছে।
জয়েন্ট লিস্টের ১১ জন আইনপ্রণেতা আনুষ্ঠানিকভাবে সুপারিশ জমা দিলে আইজেনকটের পক্ষে নেসেটের ৬৭ জন সদস্যের সমর্থন থাকার কথা। ইসরাইলের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসনের সমর্থন। এর আগে আটটি আসন পাওয়া আরব নেতৃত্বাধীন দল রা’আমও আইজেনকটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করার কথা জানিয়েছে।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটের আসনসংখ্যা ৫৩। তবে এই জোটের সব সদস্যের সমর্থনও তিনি নাও পেতে পারেন। কারণ, ইউনাইটেড তোরাহ জুদাইজমের সাতটি আসনের মধ্যে চারটি আসন রয়েছে দেগেল হা তোরাহর হাতে। দলটি জানিয়েছে, তারা নেতানিয়াহু বা আইজেনকট—কাউকেই সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করবে না।
টাইমস অব ইসরাইলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর জোট সরকার হারেদি সম্প্রদায়ের পুরুষদের বাধ্যতামূলক সামরিক চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আইন পাস করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ নিয়ে বিরোধের জেরে অতি অর্থোডক্স ইহুদিদের দলটির সঙ্গে নেতানিয়াহুর দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনে আরব দলগুলোর ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি করেছেন নেতানিয়াহু। কোনো প্রমাণ ছাড়াই তিনি বারবার অভিযোগ করেছেন, বিদেশি সহায়তায় আরব দলগুলো নির্বাচনে জালিয়াতি করেছে। তার দল লিকুদও একই অভিযোগ তুলেছে।
এ অভিযোগের পক্ষে লিকুদ কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে ভোট গ্রহণ শুরুর আগে ভোটারদের ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে তিন রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেপ্তারের ঘটনাও রয়েছে। ওই ব্যক্তিদের সঙ্গে রা’আম দলের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে এ ঘটনায় কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে দলটি।
নেতানিয়াহু ও লিকুদ আরো বলেছে, বিরোধী জোটের সঙ্গে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সহযোগিতা হবে রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। নির্বাচনের পর দেওয়া এক বিবৃতিতে লিকুদ সতর্ক করে বলেছে, আরব দলগুলোর জোটের সঙ্গে জায়নবাদী দলগুলোর সহযোগিতা ইসরাইলের জন্য ‘বিপজ্জনক’ হবে।
তবে নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পায়নি দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন। বুধবার কমিশন নির্বাচনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেছে। প্রেসিডেন্ট হারজগও ফলাফল গ্রহণ করেছেন এবং নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে, তা নির্ধারণে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন।
নির্বাচনে সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের অভিযোগ তদন্তের পক্ষে মত দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। তবে এ অজুহাতে ইসরাইলের ফিলিস্তিনি ভোটারদের হেয় না করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন তিনি। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক।
হারজগ বলেছেন, ইসরাইলের ফিলিস্তিনি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি তার ‘গভীর শ্রদ্ধা’ রয়েছে। সম্প্রতি রাজনৈতিক আলোচনায় ব্যবহৃত বর্ণবাদী বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা যে রূঢ় ও বর্ণবাদী বক্তব্য শুনেছি, আমি তার নিন্দা জানাই।’
বুধবার হারজগ ধর্মীয় জায়নবাদ ও জেহুত, শাস এবং ইসরাইল বেইতেনু দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, সরকার গঠনের দায়িত্ব কোন আইনপ্রণেতাকে দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে দলগুলোর সুপারিশ গ্রহণ করেছেন। বৃহস্পতিবারও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলবে বলে জানান তিনি।
আলোচনা শেষ হলে প্রেসিডেন্ট এমন একজন প্রার্থীকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন, যার জোট গঠনের সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি বলে তিনি মনে করবেন। এ ক্ষেত্রে প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের। সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য প্রেসিডেন্টের হাতে কয়েক দিন সময় রয়েছে। এরপর মনোনীত প্রার্থী সরকার গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে এ সময় আরো ১৪ দিন বাড়ানো যাবে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নেতানিয়াহু বা আইজেনকট কেউই সরকার গঠন করতে না পারলে আগামী বছরের শুরুর দিকে আবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লা থেকে আলজাজিরার সংবাদদাতা নুর ওদেহ বলেন, আইজেনকট সরকার গঠনে সফল হলে তিনিই হবেন ইসরাইলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে নেতানিয়াহুকে বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকায় যেতে হতে পারে।
নুর ওদেহ বলেন, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর যে প্রতিশ্রুতি আইজেনকট দিয়েছেন, এখন তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব তার। তবে সরকার গঠনের জন্য নেসেটে অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন প্রয়োজন। এ জন্য ফিলিস্তিনি-ইসরাইলি দলগুলোর ভোটও তার দরকার হবে। অথচ এসব দলের সঙ্গে জোট করতে চান না আইজেনকট।
আলজাজিরার এই সংবাদদাতার মতে, শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের পথ সুগম করতে ফিলিস্তিনি-ইসরাইলি দলগুলোর সঙ্গে তাকে কোনো ধরনের সমঝোতায় পৌঁছাতে হতে পারে। অন্তত এসব দলকে ভোটদানে বিরত রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে তার সরকার শপথ নিতে পারবে এবং ইসরাইলের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।