• শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪১ পূর্বাহ্ন
Headline
কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি, ট্রাফিক উত্তর বিভাগের কল্যাণ সভায় পুরস্কৃত হলেন সেরা পুলিশ সদস্যরা ঠাকুরগাঁও-১ উপ-নির্বাচন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীনের ভূমিধস জয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠক  ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের দাম অপরিবর্তিত থাকছে নোয়াখালীতে অস্ত্র তৈরির কারিগর গ্রেপ্তার, বন্দুক ও সরঞ্জাম উদ্ধার যুবদল আপনাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, ভাই: বিএনপি নেতাদের সহযোগিতার আহ্বান মুন্নার টয়োটার প্রথম প্রাইভেট কারে উঠলেন প্রধানমন্ত্রী মদিনার যে স্থানে নবী কারিম (সা.) তিনটি দোয়া করেছিলেন সৌদি আরবে প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর বর্বর নির্যাতন, মৃত্যুদন্ড ও শিরশ্ছেদ বন্ধ করুন শ্রমিক বিক্ষোভ সমাবেশে সাইফুল হক উৎসবমুখর পরিবেশে ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ সম্পন্ন 

কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুনে ১০ জনের মৃত্যু আগুনে ছাই হলো আনন্দের অবকাশ

উখিয়া কক্সবাজার প্রতিনিধি / ২৩ Time View
Update : রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬

  • পরিবার, স্বজন নিয়ে কক্সবাজারে আনন্দে অবকাশ যাপন করতে গিয়ে আগুনে পুড়ে প্রাণ হারালেন ১০ জন। এদের মধ্যে একই পরিবারের তিনজনসহ ৬ জন নিকটাত্মীয় রয়েছেন। কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্তোরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে শিশু ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীও আছেন। এ ঘটনায় আহত হয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন আরও সাতজন। এখনো নিখোঁজ রয়েছে কয়েকজন। ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান।

অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মধ্যে ছয়জন নিকটাত্মীয় হলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলা, তার তিন বোন- ফারিয়া কবির (৩৩), ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), ৫ বছর বয়সী এক ভাগ্নে ফাইজান নূর। নূর নাবিলার বড় বোন ফারিয়ার ছেলে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী নাফিজ তেহামী। নিহত নাফিজ, নাবিলা, ফারিয়া, মালিহা ও আলভী পরস্পরের কাজিন। নাফিজের পরিবারের নয়জন সদস্য কক্সবাজার বেড়াতে গিয়ে রিসোর্টটিতে উঠেছিলেন। তাদের মধ্যে তিনজন বেঁচে গেছেন।

নিহতদের মধ্যে আরও আছেন নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯) ঢাকার আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। অন্য দুই নিহত পর্যটকের নাম জিহাদ হাওলাদার ও তারিকুল ইসলাম বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। তাদের বিস্তারিত পরিচয় এখনো জানা যায়নি। আরেকজনকে শনাক্ত করা যাইনি। তার ডিএনএ পরীক্ষা হবে।

রিসোর্টটিতে আগুন ছড়িয়ে পড়লে এবং এর তীব্রতা বাড়তে থাকলে ভেতরে থাকা পর্যটকেরা প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি শুরু করেন। কয়েকজন দরজা-জানালা ভেঙে বেরিয়ে আসেন। কেউ কেউ ভবন থেকে লাফ দিয়েও প্রাণে বাঁচার চেষ্টা করেন।

এ সময় আহত হয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি হন সাতজন। এরা হলেন ঢাকা মহানগরীর পশ্চিম রামপুরার শিহাব সাদি (৩১), তার স্ত্রী নাফিজা (২৯), মিরপুর ১নং রোডের শিয়ালপাড়ার আবদুল মান্নান (৩৫), তার স্ত্রী ফাহমিদা (৩২), ঢাকার উত্তরার মুহাম্মদ মাসুদ (৩৩), তার স্ত্রী মেহেরুন্নেসা রোমি (৩০) ও ঢাকা দক্ষিণ কোনাসিতের আশিক (২৮)।

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন মাস্টার দোলন আচার্য্য জানান, সকাল ৭টা ২৩ মিনিটে রিসোর্টটিতে আগুন লাগার খবর পান তারা। সকাল ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করেন। পরে সকাল সোয়া ১০টার দিকে আগুন পুরো নিয়ন্ত্রণে আসে। কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহান জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১০টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এডিএম আরও বলেন, ‘উদ্ধারকৃত মরদেহগুলোর সিংহভাগ অঙ্গার হওয়ায় কয়েকজনকে পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ টেস্টের পর মরদেহ হস্তান্তরে সিদ্ধান্ত হয়েছে।’

গতকাল সকাল ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন পাটুয়ারটেক সৈকত এলাকার রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন পুরো স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ে। কাঠের তৈরি ৩ তলা রিসোর্টটি দ্রুত পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে হতাহত ব্যক্তিদের সন্ধান পান উদ্ধারকর্মীরা। প্রাথমিকভাবে রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগুন লাগার পরপরই বাতাস ও রিসোর্টের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ও সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে আগুন পুরো স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয়রা জানিয়েছে, সকাল ৭টার দিকে রিসোর্ট থেকে বিকট শব্দ শোনা যায়। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই আগুন পুরো স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানো ও উদ্ধারকাজ শুরু করেন। দীর্ঘ চেষ্টার পর বেলা ১১টার দিকে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। উদ্ধারকাজে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও এসআরবির সদস্যরা অংশ নেন।

জানা গেছে, কক্সবাজার শহরের কলাতলী থেকে প্রায় ২৯ কিলোমিটার দূরে রিসোর্টটির অবস্থান। কাঠের তৈরি রিসোর্টটিতে মোট ৯টি কক্ষ ছিল। রিসোর্টে ১৬-১৮ জন পর্যটক অবস্থান করতে পারেন। গতকালও এমন সংখ্যক পর্যটক অবস্থানের ধারণা করা হচ্ছে। তবে আগুন লাগার সময় রিসোর্টে কতজন অবস্থান করছিলেন তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আকতার জানান, মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়া আগুনে প্রথম দফায় ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে তল্লাশি চালিয়ে রিসোর্টের টয়লেট থেকে আরও চারজনের মরদেহ পাওয়া যায়।

এক স্বজন বলেন, আগুন লাগার পর তিনি রিসোর্টের দোতলা থেকে লাফ দিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন। তবে তার স্ত্রী, স্ত্রীর বোনসহ পরিবারের ছয়জন মারা গেছেন। ওই স্বজন কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন বলে জানান।

জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য (মেম্বার) শাহাব উদ্দিন জানান, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত টুপটুপ রেস্তোরাটি আমার ওয়ার্ডের পাটুয়ারটেক এলাকায়। চট্টগ্রামের আমিরাবাদে নিয়াজ ও বোয়ালখালীর তানভীর যৌথ ভাবে ২০ শতক জমি কিনে রেস্তোরাঁটি গড়েছিলেন। এর অনুকূলে পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হলেও আবাসন হিসেবে ব্যবসা পরিচালনার কোন অনুমতি বা আলাদা ট্রেড লাইসেন্স  নেওয়া হয়নি। রেস্তোরাঁয় বেশ কয়েকটি কক্ষ তৈরি করে পর্যটকদের আবাসিক সুবিধা দিয়ে বাড়তি আয় করছিল তারা।

কক্সবাজারের ডিসি এম এ মান্নান বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের শিকার রেস্তোরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টটি প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই চলছিল। সরকারি জমিতে স্থাপনা করে অবৈধভাবে বাণিজ্য করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে করা প্রতিষ্ঠান বিধায় প্রশাসন নজরে নেয়নি।’

এ রিসোর্টটি অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে গড়ে ওঠায় অপসারণে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ দুই দফা নোটিশ দেয় বলেও প্রচার পেয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে কক্সবাজারের এডিএমেট নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি আগুনের সূত্রপাত, প্রাণহানির কারণ ও রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা খতিয়ে দেখবে।

এদিকে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অগ্নিকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ১৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলা মারা গেছেন। তার মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন ও ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

ঘটনার খবর পেয়ে উখিয়া-টেকনাফের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করেন। রিসোর্টটির ইনচার্জ মো. সুমন ইসলাম জানান, আগুন লাগার পরপরই তা নেভানোর চেষ্টা করা হয়। তবে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ও সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হলে আগুন দ্রুত পুরো স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয় বাসিন্দা কামাল উদ্দিন জানান, ঘুম থেকে উঠে তিনি রিসোর্টটিতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখেন। মুহূর্তের মধ্যেই ভবনটি আগুনে পুড়ে যায়। একই এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম জানান, আগুন লাগার পর কয়েকজন পর্যটককে জীবন বাঁচাতে লাফ দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করতে দেখা গেছে।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। রিসোর্টটির রেস্টুরেন্ট ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তবে রিসোর্টের মালিক নিয়াজ মোরশেদ ও তানভীরের অবস্থান সম্পর্কে তাত্ক্ষণিকভাবে কিছু জানা যায়নি। গতকাল সন্ধ্যায় সুমনকে গ্রেপ্তার করে উখিয়া থানায় নেওয়া হয়। উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category