মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁয় গ্রামে শুরু হয়েছে দেশের একমাত্র লাল দেবী দূর্গাপূজা। ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠী পূজার মধ্যদিয়ে মৌলভীবাজারে রাজনগরের পাঁচগাঁওয়ে শুরু হয়েছে উপমহাদেশের একমাত্র লাল বর্ণের জাগ্রত দুর্গাদেবীর পূজা অর্চণা। বর্তমানে মণ্ডপগুলোতে প্রতিমা ও প্যান্ডেল সাজানোর শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ, আনন্দঘন ও নির্বিঘ্নে উদযাপন নিশ্চিত করতে মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ গ্রহণ করেছে বিশেষ নিরাপত্তা উদ্যোগ।
এদিকে, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান এই উৎসবকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজার জেলা জুড়ে বইছে আনন্দের আমেজ। মহাষষ্ঠী পূজার মাধ্যমে শুরু হয়ে আগামী ২১ অক্টোবর (বুধবার) বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে ৫ দিনব্যাপী এই বর্ণিল উৎসব।
জানা যায়, ১৪১৫ বঙ্গাব্দে নতুন জায়গায় মন্দির স্থাপন করা হয়েছে। তিনশ বছরের সময় ধরে ব্যতিক্রমী এই পূজার আয়োজন হয়ে আসছে। দেশের আর কোথাও লাল বর্ণের দেবী দুর্গার পূজা নেই। প্রতি বছর ষষ্ঠী থেকে দশমীর বিসর্জনের দিন পর্যন্ত পাঁচ দিনে দেবী দর্শনে লক্ষাধিক ভক্তের ঢল নামে এখানে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের পদচারণায় নিভৃত গ্রামটি হয়ে ওঠে কোলাহল মুখর। আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে মৃৎশিল্পীরা সুন্দর সাজে সাজিয়ে তৈরীর করেছেন লাল দেবী প্রতিমা ।
লাল দুর্গা পূজার ইতিহাস হলো স্বর্গীয় সর্বানন্দ দাস আসামের শিবসাগরে মুন্সীপদে চাকরি করতেন। তিনি ছিলেন সাধক পুরুষ। তিনি একবার আসামের কামরূপ- কামাক্ষ্যা বাড়িতে গিয়ে পূজার জন্য পাঁচ বছরের শিশু কন্যা চাইলে স্থানীয় লোকজন তাকে একজন শিশু কন্যা দেন। সাধক সেই কন্যা শিশুকে পূজা দেওয়ার এক পর্যায়ে ধীরে ধীরে কন্যার গায়ের রং বদলে গিয়ে লাল হয়ে ওঠে। বিস্মিত সাধক বুঝতে পারেন, কন্যার মধ্যে স্বয়ং দেবী ভর করেছেন।
সেই কন্যা তখন সাধককে বলেন, তুমি আমার কাছে বর চাও। সাধক তখন তার কাছে বর চাইলেন। দেবী তখন নির্দেশ দিলেন পাঁচগাঁওয়ের প্রতিমার রঙ লাল হবে। সাধক দেবীকে রাজনগরের পাঁচগাঁওয়ে যেনো দেখা দেন সেই আকুতি জানান। সেই থেকে এখানে লাল বর্ণের মূর্তিপূজা হয়ে আসছে।
জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর মৌলভীবাজারে সর্বজনীন ৮৯৮টি ও ব্যক্তিগত ১২৪টিসহ মোট ১ হাজার ২২টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জেলার শ্রীমঙ্গল ৪৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধীন সীমান্তসংলগ্ন ১০৯টি পূজা মণ্ডপের নিরাপত্তা সুসংহত করতে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
দর্শনার্থীরা জানান, অন্য প্রতিমা থেকে এটি সম্পূর্ণ আলাদা। দেশের আর কোথাও দেবী দূর্গার রং লাল বর্ণের নেই। শুধু ভারতের আসাম ও কামাক্ষ্যায় লাল বর্ণের প্রতিমা আছে। দেশ-বিদেশ থেকে প্রচুর ভক্তবৃন্দের সমাগম ঘটে।
প্রতিমা তৈরির কারিগর অশোক আচার্য জানান, এই পেশায় তাঁর দাদা ও বাবা কাজ করে গেছেন। বর্তমানে তিনি নিজেও এই প্রতিমা তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, মৌলভীবাজার জেলা শাখার সহ- সম্পাদক সুমন কল্যাণ ভট্টাচার্য বলেন বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন রূপে ও রঙের দুর্গা মা ও দুর্গোৎসবের দেখা মিললেও, লাল বর্ণের দুর্গা মায়ের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। সারা বাংলাদেশের মধ্যে এই লালদুর্গা মায়ের মন্দির অন্যতম জাগ্রত স্থান হিসেবে পরিচিত, যেখানে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক ভক্ত সমবেত হন।
পূজা পরিচালনায় দায়িত্বে সাধক সর্বানন্দ দাসের ষষ্ঠ বংশধর সঞ্জয় দাস জানান, এটি পারিবারিক পূজা। পূর্বপুরুষ স্বর্গীয় সর্বানন্দ দাস ধ্যানে বসে কুমারী পূজার মাধ্যমে লাল দুর্গার দর্শন পাওয়ার পর প্রতিবছর এখানে লাল দুর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হয়। শুধুমাত্র একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মূর্তি নির্মাণ করে পূজা আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। সেবার ঘটে পূজা হয়েছিল।
মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম জানান, দুর্গাপূজায় সর্বাত্মক নিরাপত্তা ও সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষায় জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কতা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে।