নওগাঁর মান্দায় বিরোধপূর্ণ জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি দাবি ঘিরে আইনি বিরোধ জোরালো হয়েছে। জমির মালিকানা নিয়ে একাধিক মামলা চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে আদালতের নির্দেশে জমিটি সরেজমিন তদন্ত করেছেন মান্দা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নাবিল নওরোজ বৈশাখ। তদন্তের মাধ্যমে জমির প্রকৃত অবস্থা ও দখল পরিস্থিতি যাচাইয়ের বিষয়টি সামনে এসেছে।
গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে উপজেলার মান্দা সদর ইউনিয়নের কামারকুড়ি মৌজায় এ তদন্ত পরিচালনা করা হয়।
জমিটির মালিকানা নিয়ে মামলার বাদী আল মামুনের দাবি, বিরোধপূর্ণ সম্পত্তি তাঁদের পৈত্রিক ও কবলামূলে পাওয়া। অন্যদিকে জমির দখলে থাকা দুলাল হোসেনের দাবি, তিনি বৈধ দলিলের মাধ্যমে জমি কিনেছেন। জমির মালিকানা, দলিলের বৈধতা ও দখল নিয়ে দুই পক্ষের এই বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।
মামলার বাদী আল মামুনের ভাষ্য অনুযায়ী, কামারকুড়ি মৌজার হাল খতিয়ান নম্বর ১৬৫, ১৬৬, ১৬৭, ১৬৮, ১৬৯ ও ২১২-এর মূল মালিক ছিলেন মৃত সমতুল্য মন্ডলের তিন ছেলে ময়েন মন্ডল, মহির মন্ডল ও নূর উদ্দিন মন্ডল এবং দুই স্ত্রী সঞ্জা বেওয়া ও হাজেরা বিবি।
আল মামুনের দাবি, তাঁর বাবা মহির মন্ডল নিজের অংশের পাশাপাশি ১৯৭৩ সালে তাঁর বোন দিনজান ও হাজেরা খাতুনের কাছ থেকে কবলামূলে জমি পান। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালে ওই সম্পত্তি তাঁর দুই ছেলে হাবিবুর রহমান ও আল মামুনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর মধ্যে ১৬৯ নম্বর খতিয়ানের ১৯১, ১৯৯ ও ২০০ নম্বর দাগের জমিও রয়েছে বলে দাবি তাঁর।
আল মামুনের অভিযোগ, জমিটিতে দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের ভোগদখল ছিল। সেখানে তিন শতাধিক বাঁশঝাড়, একটি বড় তালগাছ এবং আমসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ ও বনজ গাছ ছিল। পরে এসব গাছ কেটে জমিতে মাটি ভরাট করে ইটের দেয়াল দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়। জমিতে ছোট একটি ঘর নির্মাণ ও কলাগাছ লাগিয়ে দখল নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে দুলাল হোসেনের দাবি, হাজেরা বিবির মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারীরা ২০১৫-১৭ সালের একটি খারিজ মামলার মাধ্যমে প্রস্তাবিত ৭৩৯ নম্বর খতিয়ান প্রস্তুত করেন। ওই খতিয়ানে জমির পরিমাণ ৪২ দশমিক ৬০ শতাংশ বলে উল্লেখ রয়েছে। পরে ২০১৯ সালে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি শফিকুল ইসলাম ও রেহেনার কাছে হস্তান্তর করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে দুলাল হোসেন ও তাঁর স্ত্রী সানজিদা খানম সাড়ে আট শতাংশ জমি কেনেন বলে দাবি করা হয়েছে।
দুলাল হোসেন বলেন, আল মামুনের পক্ষ থেকে ১৯৭৩ সালের একটি দলিল দেখিয়ে তাঁর কেনা জমিতে দখল নিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তাঁর দাবি, দলিলটির কোনো ভলিউম নেই এবং রেকর্ড রুম থেকে যাচাই করেও এর তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া তাঁর অভিযোগ, জমিতে রোপণ করা কলাগাছ কেটে ফেলা হয়েছে এবং নির্মিত ইটের ঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনা নিয়ে একের পর এক মামলা করে তাঁকে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
দুলাল হোসেন বলেন, “আমি কাগজে-কলমে জমি না পেলে দখল ছেড়ে দেব।”
জমি নিয়ে বিরোধের ঘটনায় নওগাঁর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪/১৪৫ ধারায় মামলা করেন আল মামুন। মামলাটির নম্বর ১৪৭৪ মিস/২০২৩ (মান্দা)। ওই মামলায় আদালত নামঞ্জুরের আদেশ দিলে এর বিরুদ্ধে দায়রা জজ আদালতে ১৬৪/২৫ নম্বর ফৌজদারি রিভিশন মামলা করেন তিনি। আল মামুনের ভাষ্য অনুযায়ী, মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।
আল মামুন বলেন, “আমাদের পৈত্রিক ও কবলামূলে পাওয়া জমি দীর্ঘদিন ধরে আমরা ভোগদখল করে আসছি। কিন্তু প্রশাসনিকভাবে প্রভাব খাটিয়ে জমিটি দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা আদালতের ওপর আস্থাশীল। আদালতের নির্দেশে সরেজমিন তদন্ত হওয়ায় প্রকৃত বিষয়টি বেরিয়ে আসবে।”
আদালতের নির্দেশে সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে বিরোধপূর্ণ জমির বাস্তব অবস্থা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে তদন্তে কী তথ্য পাওয়া গেছে এবং জমির মালিকানা বা দখল বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জমিটির মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের দাবির বিপরীতে দলিল, খতিয়ান, নামজারি-সংক্রান্ত নথি ও আদালতের আদেশ যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট মামলার নিষ্পত্তি এবং প্রামাণ্য নথিপত্রের ভিত্তিতেই বিরোধের আইনগত সমাধান নির্ধারিত হবে।