• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৪ অপরাহ্ন
Headline
মিরপুরে ফুটপাত দখলমুক্ত করতে বিকেলে ফের অভিযান বিএনপি-ছাত্রদলের দুর্দিনের বহু কাণ্ডারীও ভুক্তভোগী হচ্ছেন: নাহিদ ইসলাম কালিয়ায় বিশ্ব হাত ধোঁয়া দিবস ২০২৬ পালন। ৩৭তম বিসিএসের শিক্ষা ক্যাডারের প্রভাষক পদের পদোন্নতি অগ্রগতি কতদূর? ঝালকাঠিতে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালিত মৌলভীবাজারে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উদযাপিত, আহতদের মাঝে অনুদান বিতরণ সরকারি বেতন দিতে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে সরকার এতিমখানার ইলিশ ভাগাভাগি করে নিলেন মাদ্রাসাশিক্ষকসহ দুজন, জরিমানা ৮০ হাজার ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্য  সরকার-বিএনপি গ্রহণ করেনি সৌদি আরবের তেল শোধনাগারে হামলা, বিশ্ববাজারে বাড়ল তেলের দাম

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ, বাড়ছে দারিদ্র্য, স্থবির কর্মসংস্থান: বিশ্বব্যাংক

অর্থনীতি প্রতিবেদক / ৩১ Time View
Update : বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬

  • সামাজিক সুরক্ষার বড় অংশ দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না
  • টানা চার বছর ধরে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে
  • প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশের পূর্বাভাস, জরুরি সংস্কারের তাগিদ
  • নগদ সহায়তা কর্মসূচি উন্নত করা হলে দারিদ্র্যসীমার ওপর আসতে পারে ২৮ লাখ মানুষ

জ্বালানিসংকট, আর্থিক খাতের মারাত্মক দুর্বলতা এবং রাজস্ব আদায়ে স্থবিরতার মতো অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। এর সঙ্গে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা যোগ হয়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চরমভাবে শ্লথ হয়ে পড়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, দেশের মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩.৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তবে সরকার যদি দ্রুত সাহসি সংস্কার পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং জ্বালানিসংকট দূর হয়, তবে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়ে ৩.৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। প্রতিবেদনে বিভিন্ন দিক তুলে ধরতে গতকাল মঙ্গলবার বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে মিডিয়া ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়। এতে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম, জেষ্ঠ্য অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা, নাজমুস সাদাত খান বক্তব্য দেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির গতি কমে গেছে। দুর্বল হয়ে পড়েছে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে শিল্প উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতির কারণে ব্যাংক খাতেও তৈরি হয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকি। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে কমছে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা। এর সঙ্গে বাড়ছে দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্য। অর্থনীতির এই সংকটের মধ্যে সামাজিক সুরক্ষা, বিদ্যুত্-জ্বালানি ও সারসহ বিভিন্ন খাতে সরকার বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও এর বড় অংশ দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। বরং সচ্ছল পরিবারেরাও এসব সুবিধার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পাচ্ছে। ফলে দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা অনেক মানুষ সামাজিক সুরক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে আসতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন। মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য অপরিহার্য সংস্কারকাজগুলো দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা প্রয়োজন। এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার উপযুক্ত সময় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ: বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতিতে অনেক কারখানা সক্ষমতার নিচে উত্পাদন করেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মঘণ্টা কমিয়েছে, উত্পাদন বন্ধ রেখেছে বা কর্মী ছাঁটাই করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ২ শতাংশ। তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উত্পাদন শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। করোনা মহামারির পর কোনো প্রান্তিকে শিল্প খাতের এটি প্রথম সংকোচন। অর্থনীতির ধীরগতির প্রভাব পড়েছে শ্রমবাজারেও। শিল্প ও সেবা খাতে চাকরি হারানো নারীদের অনেকে শ্রমবাজার থেকে বেরিয়ে গেছেন। নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ২০২২ সালের ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে। তবে ২০২৫ সালের পর নতুন শ্রমশক্তি জরিপ না থাকায় সামপ্রতিক পরিস্থিতি নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন।

টানা চার বছর দারিদ্র্য বেড়েছে: বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দৈনিক ৩ ডলারের দারিদ্র্যসীমায় দারিদ্র্যের হার ১ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে এই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে। জাতীয় দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী, দারিদ্র্যের হার টানা চতুর্থ বছরের মতো বেড়েছে। ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। একই সময়ে আয়বৈষম্যও বেড়েছে।

ব্যাংক খাতে বড় ঝুঁকি : ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুতর ঝুঁকিগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোয় এই হার ৫৮ দশমিক ৯ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ। ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন ও আমানত সুরক্ষা আইন পশ করাকে ইতিবাচক বলেছে বিশ্বব্যাংক। তবে দুর্বল ব্যাংককে বারবার ছাড় ও তারল্য সহায়তা দেওয়ায় প্রকৃত লোকসান শনাক্ত ও সমাধানের প্রক্রিয়া পিছিয়ে যাচ্ছে।

রাজস্ব কম, বাড়ছে চলতি ব্যয় : প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড লক্ষ্যমাত্রার ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ কর আদায় করেছে। মোট রাজস্ব জিডিপির ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। এর মধ্যে কর-রাজস্ব প্রায় ৭ শতাংশ। সীমিত করভিত্তি, কর ফাঁকি, দুর্বল প্রশাসন ও অতিরিক্ত করছাড় রাজস্ব বৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে আছে। করনীতি প্রণয়ন ও কর প্রশাসনকে আলাদা করার কাজও কার্যকর হয়নি।

সংস্কারের তিন অগ্রাধিকার : ব্যাংক খাতে সম্পদের মান পর্যালোচনা দ্রুত শেষ করে কোন ব্যাংক টিকে থাকতে পারবে, তা নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ব্যাংকের মালিক, বিনিয়োগকারী ও অন্য অংশীজনদের লোকসানের দায় বহন এবং নিয়ন্ত্রক ছাড় পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। জ্বালানি খাতে দেশীয় গ্যাস উত্পাদন ও এলএনজি অবকাঠামো বাড়ানো, বিদ্যুতের সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা উন্নত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প গ্রহণ ও বিদ্যুত্ কেনায় স্বচ্ছ এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করতেও বলা হয়েছে। রাজস্ব বাড়াতে করনীতি ও কর প্রশাসনকে আলাদা করা, সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য সমন্বয় করে কর ফাঁকি শনাক্ত করা এবং অকার্যকর করছাড় পর্যায়ক্রমে কমানোর সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক।

২৮ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে উঠে আসতে পারে : বর্তমানে সরকারের যে আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি রয়েছে তার মাত্র ৫৪ শতাংশ প্রকৃত দারিদ্র্য মানুষ উপকার পেয়ে থাকে। অর্থাত্ বড় অংশ চলে যাচ্ছে তুলনামূলক দরিদ্র্য নয় এমন জনগোষ্ঠীর মাঝে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, খাদ্য-সংক্রান্ত একাধিক ভর্তুকি একত্রিত করা এবং বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচির উন্নত টার্গেটিংয়ের সঙ্গে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ সমন্বয় ঘটানো গেলে আরো ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্যসীমার উপরে নিয়ে আসা সম্ভব হবে। সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে আরো সুনির্দিষ্টভাবে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category