যে শিক্ষক প্রতিদিন শিশুদের হাতে তুলে দেন বই,যে শিক্ষক তাদের স্বপ্ন দেখতে শেখান, যে শিক্ষক প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যান সেই শিক্ষকের জীবনেই আলো ফিরবে কবে? প্রশ্নটা শুধু ১২শ টাকার নয়। প্রশ্নটা একজন শিক্ষকের মর্যাদার।
মাস শেষে বেতন মাত্র ১২০০ টাকা! শুনতে অবিশ্বাস্য ও অবিশ্বাস্য মনে হলেও, বর্তমানের এই দুর্মূল্যের বাজারেও সামান্য এই সম্মানীতেই কোমলমতি শিশুদের শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের চা বাগান বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। যেখানে শ্রমজীবী মানুষের দৈনিক আয়ও এর চেয়ে বেশি, সেখানে আলো ছড়ানো এসব কারিগররা বছরের পর বছর কাটাচ্ছেন চরম অবহেলায়।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের চা বাগানগুলোতে বছরের পর বছর ধরে এভাবেই চলে আসছে বিদ্যালয়ের পাঠদান। শিক্ষকরা প্রতিদিন নিয়ম করে শ্রেণিকক্ষে যান, পাঠদান করেন, খাতা দেখেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খোঁজ নেন। অথচ মাস শেষে তাদের সম্মানী অনেক শ্রমজীবী মানুষের দৈনিক আয়ের চেয়েও কম।
সরিজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল হলেই বই-খাতা হাতে স্কুলে ছুটে আসে শিশুরা। তাদের কেউ স্বপ্ন দেখে ডাক্তার হওয়ার, কেউ শিক্ষক, কেউবা বড় কোনো কর্মকর্তা। আর সেই স্বপ্নের প্রথম পাঠটুকু তৈরি করেন যেসব শিক্ষক, মাস শেষে তাদের হাতে আসে মাত্র ১২শ টাকা।
জানা যায়, একজন শিক্ষক শুধু পাঠদানই করেন না; শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখান, পথ দেখান। কিন্তু সেই শিক্ষককেই যদি মাস শেষে দেওয়া হয় মাত্র ১২শ টাকা, তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এই সম্মানী দিয়ে কি একজন শিক্ষকের জীবন চলে? চা বাগানের এসব বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে হাজারো শিশু। বর্তমান সময়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে যেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে বহুগুণ, সেখানে একজন শিক্ষকের মাসিক সম্মানী মাত্র ১২শ টাকা। বিষয়টি শুধু আর্থিক সংকট নয়, এটি শিক্ষকদের প্রতি দীর্ঘদিনের এক ধরনের অবহেলার চিত্রও তুলে ধরে।
প্রাঃ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা জানান, আমাদের স্যার, ম্যাডামরা অনেক ভালো পড়ান। কিন্তু তাদের বেতন ১২০০ টাকা, যা খুবই কম। আমরা অনুরোধ করছি সরকার কাছে স্যার-ম্যাডামদের বেতন যেন বাড়ানো হয় এবং আমাদের স্কুলেও বিকেল ৪টা পর্যন্ত পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়।”
শিক্ষক ও শিক্ষিকারা জানান, স্কুলের শিশুদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে নিয়মিত কঠিন পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।নিয়ম অনুযায়ী প্রতিমাসে একটি নির্দিষ্ট বেতন পাওয়ার কথা থাকলেও তাঁরা তা পাচ্ছেন না। স্কুলের শিক্ষার মান উন্নত করতে হলে এবং শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। কিন্তু এর পরে থেকে আমরা আর কোনো উন্নতি দেখি নাই।
প্রাঃ বিদ্যালয়ে পাত্রকলা চা বাগানের প্রধান শিক্ষক প্রদীপ পাল বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বিকেল ৪টা পর্যন্ত স্কুল চালুর কথা থাকলেও, পর্যাপ্ত বেতন না থাকায় এই স্কুলগুলোতে সেই সময় পর্যন্ত পাঠদান বা কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয় না। সরকার যদি স্কুলের দিকে দৃষ্টি দেয় এবং স্কুলগুলো জাতীয়করণ করা হয়, তাহলে চা শ্রমিকদের হাজার হাজার শিশু উপকৃত হবে এবং মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
চাম্পারায় চা বাগানের প্রাঃ বিদ্যালয়ে প্রধান প্রধান শিক্ষিকা জানান, ১৪ বছর ধরে বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। তিনি মাত্র ১২০০ টাকা বেতনে শিক্ষকতা করে আসছেন এবং তার বেতন এখনও এই পর্যায়েই রয়েছে। তিনি আশা করেছিলেন যে খুব দ্রুত স্কুলটি সরকারিকরণ করা হবে, কিন্তু তা এখনও হয়নি।
মৌলভীবাজার জেলা প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা অফিসার মো: আনিছুর রহমান বলেন, মৌলভীবাজার জেলায় মোট ৬১টি বেসরকারি চা বাগান প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে, যা বাগান কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রণ করে। সম্প্রতি সরকার চা বাগান এলাকার কিছু বিদ্যালয় জাতীয়করণের উদ্যোগ নিয়েছে। বিদ্যালয়ের তালিকা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
বাংলাদেশ চা বোডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো: মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, শিক্ষকদের সহযোগিতা এবং শিক্ষকদের পক্ষ থেকে কোনো প্রস্তাব থাকলে তা সংশ্লিষ্ট চ্যানেলের মাধ্যমে পাঠানোর আহ্বান জানিয়ে ।