আজ বাইশে শ্রাবণ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮৬তম প্রয়াণ দিবস। ১৯৪১ সালের আজকের দিনে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে তার জীবনাবসান ঘটে। ৮৫ বছর পরও দিনটি বাঙালির কাছে শুধু একজন কবির প্রয়াণের তারিখ নয়, তাঁকে নতুন করে ফিরে দেখার উপলক্ষ।
মৃত্যুর আট দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তার সাহিত্য, সংগীত, দর্শন ও মানবিক চেতনা সমানভাবে আলোকিত করে চলেছে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ এবং বিশ্বসংস্কৃতিকে।
মাত্র আট বছর বয়সে লেখালেখির সূচনা হয় রবীন্দ্রনাথের। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী, চিঠিপত্র, শিশুসাহিত্য এবং গানের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। দুই হাজারেরও বেশি গান রচনা করে তিনি গড়ে তুলেছেন রবীন্দ্রসংগীতের অনন্য ধারা, যা আজও বাঙালির জীবন, সংস্কৃতি ও আবেগের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করে তিনি বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে অনন্য মর্যাদা এনে দেন। তার রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। মহান মুক্তিযুদ্ধেও তাঁর গান বাঙালিকে সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছে।
১৯০১ সালে শান্তিনিকেতনে পাঁচ শিক্ষার্থী নিয়ে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রচলিত শিক্ষার বাইরে প্রকৃতি ও মুক্ত পরিবেশে শিক্ষার যে ধারণা তিনি লালন করেছিলেন, পরবর্তী সময়ে তার বিস্তার ঘটে বিশ্বভারতীতে। শিক্ষা তাঁর কাছে কেবল পাঠ্যজ্ঞান অর্জন নয়। মানুষের সঙ্গে মানুষ, প্রকৃতি ও বিশ্বের সম্পর্ককে গভীরভাবে বোঝার পথ।
১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদসহ তাঁর কবিতার জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান রবীন্দ্রনাথ। নোবেল ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর ইংরেজিতে প্রকাশিত কবিতার সংবেদনশীলতা ও সৌন্দর্যই তাঁকে এ স্বীকৃতি এনে দেয়। বিশ্বখ্যাতির পরও দেশের বাস্তবতা থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন হননি। ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া নাইট উপাধি গ্রহণ করলেও ১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তা ত্যাগ করেন।
জীবনের শেষ প্রান্তেও তাঁর চিন্তার জগৎ থেমে যায়নি। ব্যক্তিগত বেদনা, মৃত্যু, মানুষের স্বাধীনতা, সভ্যতার সংকট ও মানবিক মর্যাদা তাঁর শেষ জীবনের ভাবনায় আরও গভীর হয়ে উঠেছিল। ফলে বাইশে শ্রাবণ কেবল তাঁর শারীরিক প্রয়াণের স্মৃতি নয়, তাঁর জীবন ও চিন্তার দিকে ফিরে তাকানোরও দিন।
রবীন্দ্রনাথকে একেক প্রজন্ম একেকভাবে আবিষ্কার করেছে– প্রেমে, বিচ্ছেদে, প্রকৃতিতে, একাকিত্বে, আনন্দে কিংবা মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষায়। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জীবনেও তাঁর উপস্থিতি গভীর– ‘আমার সোনার বাংলা’ আমাদের জাতীয় সংগীত, আর শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরের স্মৃতিতে জড়িয়ে আছে তাঁর জীবন ও সৃষ্টির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
শুধু সৃজনশীল সাহিত্য নয়– সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষা, অর্থনীতি নিয়ে স্বকীয় ভাবনাও তাঁকে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন ও গণশিক্ষার যে অগ্রযাত্রা আমরা এখন নিয়মিত প্রত্যক্ষ করি, রবীন্দ্রনাথ সেই সময় নওগাঁর পতিসর ও কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনে সে ধরনের উদ্যোগই নিয়েছিলেন। কৃষকদের কল্যাণে প্রতিষ্ঠা করেন কৃষি সমবায় ব্যাংক। নোবেল পুরস্কারের টাকার একটি অংশও এই ব্যাংকে যোগ করেছিলেন। ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে গিয়ে দেশজ আদর্শ লালিত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন শান্তিনিকেতন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু একজন কবি নন; তিনি বাঙালির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক চিরন্তন প্রতীক। সময়ের সীমানা অতিক্রম করেও তার সৃষ্টি নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।