মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় রিসোর্টের ভেতরে গোপনে গেস্টের ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ ওঠা সেই মেঘমালতি রিসোর্টের নাম ফেসবুক পেজে আকস্মিক পরিবর্তন করার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেটিজেন এবং স্থানীয় পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাপক তোলপাড় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ ঘটনায় রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ পাল্টা চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছে। প্রশাসন সুত্রে জানা গেছে এ ঘটনায় রোববার (২৬ জুলাই) পর্যন্ত কোনো পক্ষই আইনের আশ্রয় নেয়নি।
এর আগে গত ৮ জুলাই উপজেলার রাধানগর এলাকায় অবস্থিত মেঘমালতি রিসোর্টে গোপনীয়তা নষ্ট করে আপত্তিকর ভিডিও-ছবি ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেন অপূর্ব সুত্রধর নামে এক তরুণ।
এ সময় ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্থানীয়ভাবে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। শ্রীমঙ্গলের সার্বিক পর্যটন খাতের ভাবমূর্তি রক্ষায় স্থানীয় বাসিন্দারা ও পর্যটন উদ্যোক্তারাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। শ্রীমঙ্গল রির্সোট মালিক সমিতিও প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনকে অনুরোধ করেন।
রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের বিরুদ্ধে ওঠা ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ ভিত্তিহীন। ঘটনার প্রায় ১৭ দিন পর অভিযুক্ত রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ অপরাধ ঢাকতে বা সমালোচনার মুখ থেকে বাঁচতে মেঘমালতি রিসোর্টের নাম পরিবর্তন করে বেলাশেষে রিসোর্ট নামকরণ করেছেন বলে দাবি সচেতন মহলের।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, গত ৮ জুলাই অপূর্ব সুত্রধর নামে মৌলভীবাজারের এক যুবক এক তরুণী নিয়ে মেঘমালতি রিসোর্টে যান। রিসোর্টে তারা স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিলেও বাস্তবে প্রেমিক-প্রেমিকা ছিলেন। বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত রিসোর্টের একটি কক্ষে তারা অবস্থান করেন। রিসোর্ট ত্যাগ করার পর ওই তরুণের হোয়াটসঅ্যাপে আপত্তিকর ছবি দিয়ে টাকা দাবি করেন একজন। এমন অভিযোগ নিয়ে শহর থেকে কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে পরদিন রিসোর্টে যান তিনি। বিষয়টি নিয়ে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ ও তাদের মধ্যে বাকবিত-া শুরু হয়। একপর্যায়ে মারধরের ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, নাম পরিবর্তন করে অপরাধ ঢাকা সম্ভব নয়। বরং এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থার পাশাপাশি রিসোর্টে সার্বিক নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী তরুণ অপূর্ব সুত্রধর বলেন, গত ৮ জুলাই মেঘ মালতি রিসোর্টে আমি একটি রুম বুকিং করি। আমার সঙ্গে একজন ছিল। বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ছিলাম। এখান থেকে আমরা যাওয়ার পর আপত্তির ভিডিও ও ছবি ধারণ করে আমাদের প্রাইভেসি নষ্ট করা হয়। পরে এগুলো আমার হোয়াটসঅ্যাপে দিয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা টাকা দাবি করা হয়। পরে আমরা সবাই রিসোর্টে যাই বিষয়টি সমাধান করার জন্য। তবে আমি তাদেরকে টাকা দেইনি। তখন তারা আমাদের সঙ্গে মারামারি শুরু করে দেয়। বিষয়টি নিয়ে যা ঘটেছে, সবাই দেখেছে। এ বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো সমাধান হয়নি। আমার দুজন আত্মীয় আছেন, তারা দেখতেছেন। প্রয়োজনে তারা কথা বলবেন। এই বিষয়ে কথা বলার মানসিকতা আমার নেই বলে তিনি জানান।
মেঘমালতি রিসোর্টের ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, গত ৯ জুলাই এক যুবক একটা স্ক্রিনশট দিয়ে বলছে রিসোর্ট থেকে তাকে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা চাচ্ছে। তখন আমি বলি আপনি রিসোর্টে আসেন বিষয়টি নিয়ে আমরা কথা বলি। পরে তারা রিসোর্টে এসে আমাদেরকে গালাগালি ও মারধর করে। একপর্যায়ে তারা আমাদের কাছেও তারা ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা দাবি করে। তারা বলে ভিডিও দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে আমরা এই টাকা নিয়েছি। তখন আমরা বলি কার কাছে টাকা দিয়েছেন। পরে হাল্লাচিল্লা শুনে এলাকার মানুষ চলে আসেন। পরবর্তীতে সে আবার টাকা দেওয়ার কথা অস্বীকার করে। ঘটনার এক পর্যায় ট্যুরিস্ট পুলিশসহ প্রশাসনের লোকজন চলে আসেন। ছেলেটা রিসোর্টে থাকার জন্য মেয়েটাকে তার স্ত্রী পরিচয় দিয়েছে। পরে শোনা যায় মেয়েটি তার স্ত্রী নয়। আমরাতো কথার ওপর বিশ্বাস করেছি। আমরাতো আর কাবিননামা দেখতে পারি না।
রিসোর্টের নাম পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি বাড়িতে চলে এসেছি। মালিক পক্ষ নাম পরিবর্তন করেছে মনে হয়। বিষয়টি আমি পুরোপুরি জানি না।
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এস কে দাশ সুমন বলেন, আমরা যেদিন ঘর্টনা ঘটে ছিলো সেদিন আমরা গিয়ে ছিলাম রিসোর্ট। আমরা রিসোর্টের ম্যানজারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে ঘটনা কি। আমরা জিজ্ঞেস করেছিলাম এই রিসোর্টে কেউ ঘটনার সাথে জড়িত ছিলো নাকি। রিসোর্টের ঘটনার সাথে জড়িত থাকলে তাদেরকে আইনের ব্যবস্থা করতে হবে। এই রিসোর্টের নাম সারা বাংলাদেশে ভাইরাল হয়েছে। ফেসবুকে এবং বিভিন্ন মিডিয়াতে প্রচার হয়েছে। এই বদনাম থেকে বাচাঁর জন্য রিসোর্টের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে তাদের ব্যক্তিগত ভাবে।
বাংলাদেশ ট্যুরিস্ট পুলিশের শ্রীমঙ্গল জোনে ওসি মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, এক ছেলে তার প্রেমিকা নিয়ে রিসোর্টে এসেছিল। তার দাবি আপত্তিকর ভিডিও করা হয়েছে। সে বলেছে একটা স্ক্রিনশর্ট হোয়াটসঅ্যাপে দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা দাবি করা হয়েছে। আসলে স্ক্রিনশর্টের ছবিটি কতটুকু সত্য তা এখনও বোঝা যায়নি। আমরা ঘটনার দিন রিসোর্টে যাওয়ার পর এলাকার লোকজন নিয়ে বসে বিষয়টি সমাধান করে দেওয়া হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, রিসোর্টের ঘটনায় লিখিত বা মৌখিক কেউ কোনো অভিযোগ করেননি। আমরা ওই ছেলের সঙ্গে কথা বলেছি, সে বলেছে তার কোনো অভিযোগ নেই।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান জানান, আমরা সরজমিনে গিয়ে ছিলাম, আমরা বলেছিলাম এই বিষয়ে রিসোট মালিক যারা জড়িত আছে আইনের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। রিসোর্টের নাম পরিবর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন এই বিষয়ে আমি কয়েক জনের মুখে শুনেছি। কিন্তু তাদের কাগজপত্র আছে কি না এখনো যাচাই করা হয় নাই, আমাদের যাচাই করে দেখতে হবে