এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন, দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব শিল্প গ্রুপকে নতুন করে হয়রানির নীলনকশা তৈরি করেছে। স্কয়ার, বসুন্ধরা, হা-মীম, যমুনা, পারটেক্স, আকিজ, সিটি, ইউনাইটেড, প্রাণ- আরএফএল, ওয়ালটন, ট্রান্সকম গ্রুপসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে তদন্তের নামে নতুন করে হয়রানি শুরু করেছে।
গত ১৪ জুলাই দুর্নীতি দমন কমিশন এক চিঠিতে বলেছে, ‘বাংলাদেশের কতিপয় বড় বড় গ্রুপ অব কোম্পানিজের বিরুদ্ধে প্রকৃত তথ্য গোপন করে বিভিন্ন কোম্পানির একাধিক অডিট রিপোর্ট তৈরি করে ব্যাংকসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে জমা দিয়ে শত শত কোটি টাকা সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে রয়েছে।’
এই কল্পিত অভিযোগ তদন্তের জন্য দুদক বিগত ১০ বছরের (২০১৫ থেকে ২০২৫) ফাইন্যান্সিয়াল/অডিট রিপোর্ট চেয়েছে। বেশ কয়েকটি কারণে দুর্নীতি দমন কমিশনের এই চিঠি উদ্বেগজনক এবং অত্যন্ত আপত্তিকর। প্রথমত, এখন দুদকের কমিশন নেই। নতুন কমিশন গঠনের জন্য সরকার সম্প্রতি একটি সার্চ কমিটি গঠন করেছে। দুদকের আইন অনুযায়ী এ ধরনের অনুসন্ধান, তদন্ত একমাত্র কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে করা যায়। বিগত পাঁচ মাস কমিশন নেই। ড. আবদুল মোমেনের নেতৃত্বে কমিশন এ ধরনের তদন্তের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তাহলে আইন লঙ্ঘন করে কর্তৃত্ববহির্ভূতভাবে এরকম তদন্ত কার নির্দেশে? এটি সুস্পষ্ট দুদকের আইনের লঙ্ঘন। বর্তমান আইনে কমিশন ছাড়া দুদকের কিছু করার এখতিয়ার নেই। কারা এই এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ করেছে? যারা করেছে তারা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, যখন সরকার বেসরকারি খাতে গতি ফেরাতে বাজেটে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ঠিক তখনই দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি মহলের এই তৎপরতা কি সরকারের উদ্যোগ ভেস্তে দেওয়ার জন্য? তৃতীয়ত, যখন নতুন কমিশন গঠন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে তখন তড়িঘড়ি করে দেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অযাচিতভাবে হয়রানির উদ্দেশ্য কী? সর্বশেষ, কীসের ভিত্তিতে এই অভিযোগ? এই একটি ঘটনা বলে দিচ্ছে সরকারের ভিতরেই সক্রিয় রয়েছে শত্রু। যারা সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য নানানরকম ষড়যন্ত্র করছে। শুধু দুদক নয়, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভিতরে থাকা সরকারের লোকজন সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করছে। এরা ঘরের শত্রু বিভীষণের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এখনো প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে এমন সব লোকজন, যারা শুধু বিএনপির মতাদর্শের বিরোধী নন, বিগত নির্বাচনে বিএনপির বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। এখন তারাই ভোল পালটে ফেলেছেন। বাইরে এরা যতই এখন শহীদ জিয়ার সৈনিক সাজুক না কেন, তারা বিএনপির ক্ষতি করার চেষ্টা করবে সুযোগ পেলেই।
২০২৪ সালের পাঁচ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের তিন দিন পর ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। ইউনূস ক্ষমতা নিয়েই সর্বস্তরে ব্যাপক পরিবর্তন করেন। প্রধান বিচারপতি থেকে শুরু করে নিম্ন আদালতের বিচারক, মন্ত্রিপরিষদ সচিব থেকে সহকারী সচিব, পুলিশের আইজি থেকে থানার ওসি- সব পর্যায়ের রদবদল করা হয়েছিল। ইউনূস সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা। সেজন্য তিনি এমনভাবে সবকিছু সাজিয়েছিলেন যাতে নির্বাচনের পক্ষে কেউ কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে না থাকে। এসব রদবদল করা হয়েছে দুটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের তালিকা অনুযায়ী। এ সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা সচিবালয়ে অবস্থান করতেন, তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী রদবদল করা হতো। অনেক উপদেষ্টা মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে জেলা প্রশাসক থেকে সচিব পর্যন্ত পদায়ন দিতেন। টাকার বিনিময়ে পদায়ন ছিল ইউনূস সরকারের সময়ে একটি স্বাভাবিক ঘটনা। এসব নিয়ে পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হলেও অন্তর্বর্তী সরকার সেসবকে পাত্তা দেয়নি। বরং লোকদেখানো তদন্ত কমিটি করে সব দুর্নীতিকে বৈধতা দিয়েছে। তাই ইউনূস সরকারের আমলে যারাই বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পেয়েছেন তাদের সততা এবং যোগ্যতা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। তার চেয়েও বড় কথা হলো- এমনভাবে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাজানো হয়েছিল যেন বিএনপি কোণঠাসা থাকে। এই প্রশাসন পাঁচ মাসেও পুরোপুরি পরিবর্তন করা হয়নি। ফলে মাঠ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য, এনবিআরসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছেন যারা সরকারের বিরুদ্ধে নীরবে ষড়যন্ত্র করছে। এখনই এদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে ঘরের ইঁদুর বাঁশ কাটবে। এই সরকারকে সফল হতে হলে শক্রদের এখনই চিহ্নিত করতে হবে। শত্রুর সঙ্গে বসবাস করে বিএনপি কীভাবে ৩১ দফা বাস্তবায়ন করবে?