কম্বোডিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের মতো দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে পরিবারের সদস্যদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা শেখ হাসিনারও ছিল বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন।
বুধবার (৮ জুলাই) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের আয়োজনে ‘মননে জুলাই’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, জুলাই আন্দোলন যেমন একদিনে গড়ে ওঠেনি, তেমনি আওয়ামী লীগের পতনও কোনো একদিনের ঘটনা নয়। সিরিয়া, লিবিয়া ও ইয়েমেনের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকার পতনের পর অনেক দেশে গৃহযুদ্ধ ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে। আবার সব দেশে সরকার পরিবর্তনও ঘটে না।
কম্বোডিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ২০২৩ সালে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর হুন সেন তার ছেলে হুন মানেতের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। শেখ হাসিনাও ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চেয়েছিলেন। তিনি ক্ষমতা ছাড়লেও ছেলে, মেয়ে কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তা সম্ভব হয়নি। কারণ, বিএনপি ধারাবাহিকভাবে শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
জুলাই আন্দোলনের পটভূমি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ যেমন হঠাৎ করে হয়নি, তেমনি জুলাই আন্দোলনও কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক রাজনৈতিক আন্দোলন ও প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যার ধারাবাহিকতায় জুলাই আন্দোলন সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, জুলাই কোনো একজন ব্যক্তি বা একদিনের অবদানে সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘদিনের গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের আর্তনাদ, বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ, সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্পৃক্ততায় আন্দোলন পূর্ণতা পেয়েছে। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল স্বৈরাচারী শাসনের অবসান।
আন্দোলন-পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রসঙ্গে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, জুলাই সফল হওয়ার পর রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে বিভিন্ন মত উঠে আসে। কেউ বাংলাদেশকে ইসলামিক রিপাবলিক করার কথা বলেছেন, কেউ সংবিধান স্থগিত রেখে বিপ্লবী সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন, আবার কেউ নতুন সংবিধান প্রণয়নের দাবি তুলেছেন। তবে সরকার একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে।
তিনি বলেন, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করা হয়েছে। সরকারের ভুল-ত্রুটি থাকতে পারে, তবে সেগুলো সংশোধন করে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করতে চায়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শাহ নিসতার জাহান কবীর।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাদারীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দিন এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিনা শারমিন।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, শিক্ষক, কর্মকর্তা, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।