প্রধানমন্ত্রী বারবার অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর জোর দিচ্ছেন। বেসরকারি খাতকে সচল করার জন্য নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে বর্তমান সরকার। কিন্তু বাস্তবতা হলো ভিন্ন। বেসরকারি খাতের মনোবল ও আস্থা ফেরাতে সরকারে উদ্যোগের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বেসরকারি খাতকে সচল করতে হলে প্রথমে এই খাতের ক্ষত সারাতে হবে। গত দেড় বছরে ইউনূস সরকার দেশের বেসরকারি খাতের প্রায় কবর রচনা করেছে। বিভিন্ন কলকারখানা মব হামলার শিকার হয়েছে। অনেক শিল্পকারখানায় আগুন দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছিল। বিএনপি সরকার বন্ধ কারখানা চালু করার জন্য আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে নতুন বাজেটে। কিন্তু অর্থমন্ত্রী নিজে একজন ব্যবসায়ী ও শিল্প-উদ্যোক্তা। তিনি ভালো করেই জানেন, কেবল টাকা দিয়েই বন্ধ কলকারখানা চালু করা যায় না। বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু করার জন্য চাই উপযুক্ত এবং সহায়ক পরিবেশ। ইউনূস সরকারের দেড় বছরের শাসনকালে বেসরকারি খাতের মনোবল ভেঙে গেছে। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ইউনূস সরকার বেসরকারি খাতের ইমেজ নষ্ট করার এক ঘৃণ্য অপচেষ্টা করেছিল। মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে সামাজিকভাবে হেনস্তা করা হয়েছে ব্যবসায়ীদের। এই অবস্থার পরিবর্তন না হলে বেসরকারি খাত ঘুরে দাঁড়াবে না।
কিন্তু সরকারের ভিতরের একটি চক্র বেসরকারি খাতে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে দিচ্ছে না।
দায়িত্ব গ্রহণের পরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হবে। চার মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত এসব মিথ্যা, হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি। ইউনূস সরকার এসব মামলা করে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল। কেন চার মাসেও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার হলো না? কারা সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে দিচ্ছে না?
ইউনূস সরকার বহু শিল্প-উদ্যোক্তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বেআইনিভাবে জব্দ করেছিল। বিচারের আগে শাস্তি নজিরবিহীন এবং সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অর্থমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করেছিলেন দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করবেন। কিন্তু চার মাস পেরিয়ে গেলেও সমস্যার সমাধান হয়নি।
বর্তমানে আমরা একটি বৈশ্বিক যুগে বসবাস করি। এখন শুধু দেশে বসে ব্যবসাবাণিজ্য করা অসম্ভব। ইউনূস সরকার গায়ের জোরে বহু ব্যবসায়ী, শিল্পপতিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের বিদেশভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। এ ধরনের আদেশ কেবল আইন ও সংবিধানের লঙ্ঘন নয়, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের অবমাননা। কারণ সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, কেবল মামলা আছে এই যুক্তিতে কোনো নাগরিকের ওপর বিদেশভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যাবে না। ড. ইউনূস সংবিধান, আইন, আদালতের রায় কিছুই মানতেন না। কিন্তু বর্তমান সরকার তো জনগণের নির্বাচিত সরকার। সবাই আশা করে এই সরকার আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে। সরকার বারবার আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে তাদের অবস্থানের কথা বলছে। তাহলে কেন এই বেআইনি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হচ্ছে না?
বন্ধ কারখানা চালু করার জন্য টাকা দিলেই হবে না। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। মিথ্যা মামলা, বিদেশভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা বিনিয়োগের পরিবেশ নষ্ট করে। যা ইউনূস সরকার করেছিল। কিন্তু সেই পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি এখনো। ফলে সরকারের নানা ধরনের আশ্বাসের পরও বেসরকারি খাতের পালে হাওয়া লাগেনি।
প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই জানেন, বিগত ১৭ বছর দেশ কীভাবে চলেছে। সবকিছু দলীয়করণ করা হয়েছিল। একটা গ্যাসের লাইন পেতেও সরকারের কাছে ধরনা দিতে হতো। সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখতে পারলে ব্যবসাবাণিজ্য করা অসম্ভব ছিল। তাই সেই সময়ে ব্যবসায়ীরা সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছিল বাধ্য হয়েই। শিল্প বাঁচাতে, লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থানের জন্য, অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এর কোনো বিকল্প ছিল না। কিন্তু ইউনূস ক্ষমতায় এসেই এসব শিল্প-উদ্যোক্তাকে দোসর বানিয়ে দেন। যেসব ব্যবসায়ী সরাসরি রাজনীতি করেন তাঁরা ছাড়া অন্য বিশালসংখ্যক ব্যবসায়ী কোনো দলের না। তাঁদের ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হয়, শিল্পের জন্য, অর্থনীতির জন্য। অথচ সরকার পরিবর্তন হলেই তাঁদের কেন গলা টিপে ধরা হবে?
অতীতে সব সরকারই ক্ষমতায় এসে ব্যবসায়ী শিল্প-উদ্যোক্তাদের অনুগত বানাতে চায়। এই সংস্কৃতি থেকে বর্তমান সরকার বেরিয়ে আসার কথা বলেছে বটে কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আবার নতুন করে অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে বেসরকারি খাতকে বিভক্ত করা হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠিত এবং শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করা হচ্ছে। দেশের স্বার্থে এই বিভাজন দূর করা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী নিজে যেখানে সবার আগে বাংলাদেশ- তাঁর রাজনৈতিক দর্শন বলছেন, তখন এই বিভাজন তৈরি করে কারা দেশকে পেছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে? এই সরকার ক্ষমতায় এসেছে একটি গণ অভ্যুত্থানের পটভূমিতে। যেই গণ অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা ছিল ঐক্য, বৈষম্যহীন, সমতার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু ইউনূস সরকার ঐক্যের বদলে বিভক্তি সৃষ্টি করেছিল। বিরুদ্ধ মতকে পৈশাচিক শক্তি দিয়ে দমন করার এক ভয়াবহ প্রবণতা চালু করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ইউনূস দেশকে বৈষম্যমুক্ত করেননি, বরং বৈষম্য বাড়িয়েছেন। সমতার বাংলাদেশের বদলে ইউনূসের দর্শন ছিল দমনের বাংলাদেশ। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার জন্য ইউনূস দেশে এক বিশৃঙ্খল ও অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলেন। দেশের মানুষের দম বন্ধ হয়ে আসছিল। এখান থেকে মুক্তির জন্য মানুষ বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। এ দেশের মানুষ আর হিংসা, হানাহানি চায় না। বাংলাদেশের মানুষ শান্তি চায়। বিএনপি নির্বাচনের প্রচারণায় সেই শান্তির বার্তা দিয়েছে। এখন সময় প্রতিশ্রুতি পূরণের। কিন্তু সময় দ্রুত চলে যাচ্ছে। এভাবে চললে মানুষ আশাহত হবে। এখনো প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে ইউনূসের অপছায়া। এরা সরকারের ভালো সিদ্ধান্তগুলো কার্যকর করতে বাধা দিচ্ছে প্রতি পদে। চার মাসেও সরকার প্রশাসন ঢেলে সাজাতে পারেনি। আমলাতন্ত্রে এখনো ইউনূসের ঘনিষ্ঠরা বিএনপিপ্রেমিক সেজে রাজত্ব করছে। মনে রাখতে হবে, এরাই নির্বাচন বানচালের জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর যেভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাজিয়েছিল এখনো তার মূল কাঠামো পরিবর্তন হয়নি। শুধু উচ্চপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা পরিবর্তন করলেই প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিবর্তন হয় না। মাঠপর্যায়ে পরিবর্তন দরকার। না হলে দেশের গুণগত পরিবর্তন হবে না। সম্প্রতি বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় নাঈম হাসানকে মারধর ও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় অভিযুক্ত দুইজন পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার কথা জানিয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকেই বাংলাদেশে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। এই ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরকারের রাজনৈতিক আকাক্সক্ষার বিপরীতে কাজ করেছে কি না, সেই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। বিএনপি নেতারাই বলছেন, ইউনূস সরকারের প্রশাসন দিয়ে বিএনপি সফল হতে পারবে না।
ইউনূস সরকারের বিতর্কিত এবং দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সারা দেশে যেভাবে আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগই এখনো বহাল তবিয়তে আছেন। এঁরা প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক অভিপ্রায়ের বিরুদ্ধে কাজ করছেন। ইউনূস আমলে নিয়োগ পাওয়া বিচারকদের নিয়োগ বাতিল করা হয়নি। বিভিন্ন দেশে ইউনূস সরকার যে কূটনীতিক নিয়োগ দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজনকে সরানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে সরকারের সঠিক বার্তা যাচ্ছে না।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চাটুকারদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। কিন্তু অতীতের মতো বিএনপি সরকারের চারপাশে চাটুকারদের দৌরাত্ম্য ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। প্রশাসনে, পুলিশ বাহিনীতে নব্য বিএনপির দাপট বেড়েই চলেছে। প্রধানমন্ত্রী যেখানে মেধা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে পদায়ন এবং পদোন্নতি অনুশাসন দিয়েছেন সেখানে কে ছাত্রদলের কত বড় নেতা ছিলেন তা প্রমাণের প্রতিযোগিতা ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। যারা ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির সমালোচনায় মুখর ছিল, যারা এক-এগারোর সময় বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান এবং আরাফাত রহমান কোকোকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তারের পরামর্শ দিয়েছিল, তারাই আবার সরকারের কাছের মানুষ সেজেছে। শুরু হয়েছে তেলবাজির প্রতিযোগিতা। প্রধানমন্ত্রী ঈদের পরদিন সরেজমিন দেখেছেন, সিটি করপোরেশন যা বলেছে তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। এরকম নজরদারি সারা দেশে করা সম্ভব নয়। আর সেজন্যই সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও ৩১ দফা বাস্তবায়নের জন্য চাটুকার, তথাকথিত দলীয় লোকের চেয়েও বেশি প্রয়োজন যোগ্য, মেধাবী এবং দক্ষ লোক। যারা দেশকে ভালোবাসে। যারা সরকারের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন করতে সক্ষম। যাদের কোনো নিজস্ব এজেন্ডা নেই। সেটা না হলে, সরকারের সুন্দর পরিকল্পনার পরি উড়ে যাবে আর কল্পনাতেই থাকবে সবকিছু।
সরকারের পেছনে ফিরে তাকানোর সময় এসেছে। কেন চার মাসেও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে পারেনি সরকার? কেন এত দিনেও ইউনূস সরকারের ঢালাও অবৈধ বিদেশভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বাতিল করা হচ্ছে না? কেন দেশে মব সন্ত্রাস বন্ধ হচ্ছে না? এরকম অনেক প্রশ্ন এখন সামনে আসছে। এই সরকারের হানিমুন সময় পার হয়ে গেছে। এখন প্রতিশ্রুতি আর কাজের সামঞ্জস্য আনতে হবে। কথা আর কাজের মিল না থাকলে অবিশ্বাস বাসা বাঁধবে জনগণের মনে।







