ঈদের আনন্দ যখন চারদিকে, তখন মৌলভীবাজারের হাওরপাড়ের বহু কৃষক হাজারো কৃষক পরিবারের ঘরে বইছে চোখে মুখে হতাশা, বুকভরা দীর্ঘশ্বাস। টানা বৃষ্টি আর পানিতে নষ্ট হয়েছে ধান, ভেসে গেছে বছরের স্বপ্ন। ফলে ঈদের আনন্দ এখন তাদের কাছে কেবলই দূরের স্বপ্ন।
মৌলভীবাজারে ছোট বড় ১৫টির অধিক হাওরের বোরো ধান এখন শুধু পানি আর ক্ষয়ক্ষতিই রয়েছে। মৌলভীবাজারের হাকলিুকি,কাউয়াদিধি ,হাইলসহ ছোট বড় ১৫টি হাওরের কৃষকরা। হাজার হাজার হেক্টর বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে ক্ষতি শত কোটি টাকার। ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কৃষকের মুখে এখন আর ঈদের হাসি নেই। যে ধান বিক্রি করে সন্তানদের নতুন জামা কিনবেন, ঋণ শোধ করবেন, সংসারে স্বস্তি ফিরবে সেই স্বপ্ন এখন পানিতে ভাসছে। কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব সবখানে পড়ে। এবার ঈদের আগেই সেই বাস্তবতা চোখে পড়ছে।” হাওরজুড়ে এখন শুধুই ক্ষতির হিসাব। পানিতে ডুবে নষ্ট হয়েছে কৃষকদের বছরের একমাত্র সম্বল।
জেলার রাজনগর, কুলাউড়া, কমলগঞ্জ ও সদর উপজেলার বিভিন্ন হাওরাঞ্চলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কোথাও কাটা ধান ভিজে নষ্ট হচ্ছে, কোথাও আবার জমিতে দাঁড়ানো ধান পানির নিচে।
অনেক কৃষক শেষ চেষ্টা হিসেবে ভেজা জমি থেকে ধান কাটছেন। কেউ কেউ ভিজে ধান শুকানোর জন্য রাস্তার পাশে ছড়িয়ে রেখেছেন। কিন্তু বৃষ্টির কারণে সেই ধানও ঠিকভাবে শুকাতে পারছেন না।
“গ্রামের অর্থনীতি মূলত কৃষির ওপর নির্ভরশীল।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্রে জানা যায়, মোট ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ২৭ হাজার ৪৬৩ জন এবং ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ২০৬ হেক্টর। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ১২ হাজার ৩০১টি কৃষক পরিবারকে প্রাথমিক সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে।
কৃষকরা জানান, “এবার ঈদ আমাদেরকে হাওরেই করতে হবে, এবারে ঈদে বাচ্চাদেরকে কোনো কাপড়ও কিনে দিতে পারবো না”। “এবার আমাদের ধান সব নষ্ট হয়ে গেছে, এই পচা ধানগুলো গরুদেরকে খাওয়াচ্ছি”। যে ধান বিক্রি করে ঈদের খরচ চালানোর কথা ছিল, সেই ধান এখন আর বাজারে নেওয়ার অবস্থায় নেই। “পেটের ভাতেরই যোগান করতে পারছি না ওদ করবো কিভাবে, একটা গেঞ্জিও কিনতে পারবো না, পচা ধান নিয়েই আমাদের ঈদ হবে”।
ভোরের আলো ফুটতেই হাওরের দিকে হাঁটছিলেন কৃষক আব্দুল মন্নান বুকভরা আশা নিয়ে কয়েকদিন আগেও তিনি ধানের শীষে হাত বুলিয়ে বলেছিলেন “ঈদের আনন্দ এবার পানির নিচে, ধান যেগুলো তুলে এনেছিলাম সেগুলো মেশিনে যাচ্ছে না, পা দিয়ে পাড়িয়ে যা হয় তা নিচ্ছি, এ থেকে যা আসে তা নিয়েই এবার ঈদ করতে হবে। চারদিকে শুধু পানি আর ভেসে থাকা ধানগাছ। মনে হচ্ছে, পানির সঙ্গে ভেসে গেছে পুরো পরিবারের স্বপ্নও।
“ঈদ কিভাবে করমু?”রাজনগরের এক কৃষক আব্দুল কাদির আক্ষেপ করে বলেন, “পাহাড়ি পানি এসে সব ফসল ডুবে গেছে, কিছু তুলেছিলাম সেগুলো নিয়েই বিভ্রান্তিতে আছি, এবার আমাদের কৃষকদের জন্য ঈদ নয়”।
কুলাউড়ার হাওরপাড়ের কৃষক নুরুল ইসলাম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, কোথাও ধান শুকানোর সুযোগ নেই, আবার কোথাও মেশিনেও নেওয়া যাচ্ছে না ভেজা ধান। বাধ্য হয়ে পা দিয়ে মাড়িয়ে যা পাওয়া যাচ্ছে, তা নিয়েই টিকে থাকার চেষ্টা করছেন কৃষকরা।
মৌলভীবাজার হাওর রক্ষা আন্দোলন কমিটির সদস্য সচিব খসরু চৌধুরী বলেন, “আগাম বৃষ্টিতে কৃষকরা পরিবার-পরিজন নিয়ে একেবারে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে। ঈদের অনেকের ঘরে আনন্দের বদলে এখন দুশ্চিন্তা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত সহায়তা করা হলে তারা অন্তত পরিবারকে নিয়ে স্বাভাবিকভাবে ঈদ উদযাপন করতে পারবে। বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিতে বিবেচনার জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।”
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জালাল উদ্দিন বলেন, “চলতি বছরে প্রাক-বর্ষা স্বাভাবিক সময়ের প্রায় ২৫ দিন আগেই শুরু হওয়ায় জেলার নিম্নাঞ্চলগুলো হঠাৎ পানিতে তলিয়ে যায়। এতে অনেক কৃষকের পাকা ও আধাপাকা ধান পানির নিচে চলে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও জেলা কৃষি বিভাগের সমন্বয়ে যাচাই-বাছাই করে তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। আশা করছি, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই তালিকাভুক্ত বাকি কৃষকদের কাছেও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।”
মৌলভীবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: রাজীব হোসেন বলেন,“এবার অতিবৃষ্টির ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং সরকারি বরাদ্দ আসার সাথে সাথেই তাদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হবে।