টানা বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারে গত তিন দিন ধরে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করায় প্রায় ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যার কারণে হাজারো মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিলেও দুর্গত এলাকায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, শনিবার থেকে জেলার নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করায় বন্যা পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে।
জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মনু ও ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের একাধিক স্থানে ভাঙনের ফলে সদর, কমলগঞ্জ, রাজনগর, কুলাউড়া ও অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলায় অন্তত ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। রাজনগর ও সদর উপজেলার ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ২ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলার প্রায় ৩৮ থেকে ৫০ হাজার মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অধিকাংশ দুর্গত এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী পৌঁছেনি। হাতে গোনা কিছু পরিবার শুকনো খাবার পেলেও অধিকাংশ মানুষ সরকারি বা বেসরকারি কোনো সহায়তা পাননি। ফলে অনেক পরিবার চরম মানবিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
সরেজমিনে কমলগঞ্জ উপজেলার পতনঊষার ও রহিমপুর এবং রাজনগর উপজেলার টেংরা, কামারচাক ও পাঁচগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বন্যার পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে। তবে এখনো অধিকাংশ বাড়িঘর ও আঙিনায় পানি জমে রয়েছে। অনেক পরিবার ঘরের ভেতরেই পানি নিয়ে বসবাস করছে। বিশুদ্ধ পানির সংকটের পাশাপাশি রান্না করা ও খাবার সংগ্রহ করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের বন্যাকবলিত এলাকার বাসিন্দা সাইফুর রহমান, হাওয়া বেগম ও সইফুল মিয়া বলেন, “তিন দিন ধরে আমরা পানিবন্দি। অনেক বাড়িতে এখনো হাঁটুসমান পানি রয়েছে। এখন পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারিভাবে কেউ কোনো খাবার নিয়ে আসেনি। যাদের ঘরে পানি উঠেছে তারা খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন, আবার কেউ নিজ ঘরেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন।”
জেলা প্রশাসক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় ১ হাজার ৭৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ৯০ মেট্রিক টন চাল এবং ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী এসব ত্রাণসামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিতরণ করা হচ্ছে।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওয়ালিদ বলেন, “গত রাত থেকে জেলার নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। আশা করছি, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে দ্রুত বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে।”
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, “বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় চাল, শুকনো খাবার ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেনাবাহিনীসহ সকল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে তাদের সহায়তা নেওয়া হবে।”