উজানের পাহাড়ি ঢল ও টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টিতে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নে মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর একই স্থানে বাঁধ ভেঙে হাজারো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) স্থায়ী কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ফলে প্রতি বছরই বন্যার দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে এলাকাবাসীকে।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর এলাকায় মনু নদীর বাঁধ আকস্মিকভাবে ভেঙে গেলে মুহূর্তেই লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ে। অল্প সময়ের মধ্যেই একামধু, গণেশপুর, খান্দিরকুল, আকুয়া, করতল, সালনসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রাম পানিতে তলিয়ে যায়। হঠাৎ বন্যার পানিতে শত শত ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়। প্রাণ বাঁচাতে অনেক পরিবার ঘরের আসবাবপত্র, ধান-চাল ও প্রয়োজনীয় মালামাল ফেলে ওয়াপদা বাঁধ কিংবা প্রশাসনের আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়। তবে অনেক আশ্রয়কেন্দ্রেও হাঁটুসমান পানি থাকায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উজিরপুর এলাকার বাঁধটি দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ। অতীতেও অন্তত দুইবার একই স্থানে বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়েছিল। এরপরও স্থায়ী সংস্কার বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি পাউবো। গ্রামবাসী নিজেরাই স্বেচ্ছাশ্রমে বালুভর্তি বস্তা ফেলে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত নদীর প্রবল স্রোতের কাছে তা টিকেনি।
একামধু গ্রামের তরুণ মারুফ আহমেদ বলেন, “আমরা প্রমাণ দিতে পারব, পানি উন্নয়ন বোর্ড আমাদের বন্যার হাত থেকে রক্ষায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। প্রতি বছর একই অবস্থা। এবার আমার বাড়িও পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি, সেখানেও পানি ঢোকার আশঙ্কা রয়েছে। ওয়াপদা বাঁধের সড়কেও কোনো সংস্কার হয় না।”
একই গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল বলেন, “উজিরপুরের ভাঙা বাঁধে সময়মতো ভালোভাবে কাজ করা হলে অন্তত ৮ থেকে ১০টি গ্রামের মানুষ আজ পানিবন্দী হতো না। আমার ঘরে কোমরসমান পানি। আসবাবপত্র সব নষ্ট হয়ে গেছে। আমাদের গ্রামের শত শত পরিবার এখনো ঠিকমতো খাবার পায়নি।”
আকুয়া গ্রামের সুমি বেগম বলেন, “বিকেল চারটার দিকে বাঁধ ভেঙেছে। এত দ্রুত পানি ঢুকেছে যে কাপড়চোপড়, আসবাবপত্র বা গবাদিপশু কিছুই বের করতে পারিনি। এখনো ত্রাণ পাইনি। আমরা চরম অসহায় অবস্থায় আছি।”
উজিরপুর গ্রামের জসিম মিয়া বলেন, “আমরা সারাদিন চেষ্টা করেও বাঁধ রক্ষা করতে পারিনি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাউকে তখন মাঠে দেখিনি। এখন পুরো গ্রাম পানির নিচে, খাবারেরও সংকট দেখা দিয়েছে।”

এ বিষয়ে মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওয়ালীদ বলেন, “বর্তমানে পানির প্রবল চাপ থাকায় কাজ করা সম্ভব নয়। পানি কমে গেলে ভাঙা অংশে জরুরি সংস্কারকাজ শুরু করা হবে। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। তবে জমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে। অনেক জমির মালিকানার কাগজপত্রে সমস্যা থাকায় কাজ এগোচ্ছে না।”
এদিকে শুক্রবার সকালে উজিরপুর থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে তারাপাশা সংযোগ সড়কের আকুয়া অংশে ওয়াপদা বাঁধও ভেঙে যায়। এতে ওই সড়কে যানবাহন ও মানুষের চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে। নতুন করে আরও কয়েকটি গ্রামে বন্যার পানি ঢুকে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত ভাঙা বাঁধ মেরামতের পাশাপাশি স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ না হলে আগামী বছরগুলোতেও একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রাজনগর উপজেলার টেংরা, কামারচাক, মনসুরনগরসহ পাঁচটি ইউনিয়নের ৩০ থেকে ৩৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, পানিবন্দী মানুষের সংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি। তবে উপজেলা প্রশাসনের হিসাবে ২৫ থেকে ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে এবং পানিবন্দী রয়েছেন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার মানুষ।