• বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৫১ অপরাহ্ন
Headline
রাণীনগর স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে রশিদ ছাড়াই নেওয়া হচ্ছে এক্সরে-আলট্রার টাকা, নয়ছয়ের অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে নাহিদ ইসলামের বক্তব্য প্রত্যাহারে আইনি নোটিস আদালত চত্বরে সাংবাদিকদের সাথে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় পরীমনির মুচলেকা দিয়ে জামিন পেলেন পরীমনি সিইপিজেডে শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বেপজার বৈঠক নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী ষড়যন্ত্রকারীদের ২০২৪ সালের মতোই জনগণ উচিত জবাব দেবে: প্রধানমন্ত্রী নুতন কুড়ি স্পোর্টস ( সিজন- ২)  শুভ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালে যুক্ত কালিয়া উপজেলা প্রশাসন। নওগাঁ জেলা জামায়াতের নতুন আমির মাওলানা মাহফুজুর রহমান মোংলা বন্দর হবে সম্ভাবনাময় নতুন অর্থনৈতিক হাব: প্রধানমন্ত্রী

রাণীনগর স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে রশিদ ছাড়াই নেওয়া হচ্ছে এক্সরে-আলট্রার টাকা, নয়ছয়ের অভিযোগ

রাণীনগর (নওগাঁ) প্রতিনিধি: / ৩৩ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬

নওগাঁর রাণীনগর উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে সেবা নিতে আসা রোগীদের কাছ থেকে রশিদ ছাড়াই এক্সরে ও আলট্রাসনোগ্রাফির জন্য টাকা নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে আউটসোর্সিং কর্মী হিসেবে কর্মরত সবুজ নামের এক কর্মচারী রোগীদের কাছ থেকে ২১০ টাকা করে নিয়ে এক্সরে করে দিচ্ছেন। তবে বিপরীতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দিচ্ছেন না কোনো রশিদ।

এদিকে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধানই রশিদ ছাড়া করে দিচ্ছেন আলট্রাসনোগ্রাফির পরীক্ষা। স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. কে এইচ এম ইফতেখারুল আলম খান ২২০টাকার বিনিময়ে সেবাগ্রহীতাদের আলট্রাসনোগ্রাফি করে দিচ্ছেন। তবে সেখানেও রসিদ দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতারা। অভিযোগ এই কর্মকর্তার সাহসেই সবুজ নামের ওই কর্মচারী রশিদ ছাড়াই টাকা নিয়ে এক্স-রে করে দিচ্ছেন।

সূত্রের দাবি, এসব অর্থ ( ইউজার ফি বলা হয়) জমা দেন স্টোর কিপার সাদেকুল ইসলাম। ফলে এই স্টোর কিপারের ইউজার ফি জমা দেওয়া নিয়েও আছে প্রশ্ন। কারণ তার বিরুদ্ধেও আছে স্থানীয়দের বিস্তর অভিযোগ। যার কারণে অনেকে অভিযোগ করে বলছেন দুই কর্মচারী ও এক কর্মকর্তা মিলেমিশে সরকারি অর্থ নয়ছয় করছেন।

এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফির মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসেবায় রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হলেও সেই টাকার বিপরীতে দেওয়া হচ্ছে না সরকারি রসিদ। ফলে রোগীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে গুরুতর প্রশ্ন।

জানা যায়, ৫০ শয্যা বিশিষ্ট এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সপ্তাহে ৬দিন হয় এক্স-রে আর তিন দিন হয় আলট্রাসনোগ্রাফির পরীক্ষা। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। জরুরি বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ৩০টি এক্স-রে করা হয় এবং আলট্রাসনোগ্রাফির পরীক্ষা করানো হয় গড়ে ১০-১৫ জনের।

গত বৃহস্পতিবার (২৯অক্টোবর ও ৩নভেম্বর) সরেজমিনে গিয়ে এমনই ভয়াবহ রশিদ বিহীন অর্থ আদায় ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে রাণীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় বাসীন্দা ও সূত্রের অভিযোগ, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্বশীল ওই কর্মকর্তাকে ঘিরে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। যার কারণে রসিদ ছাড়াই রোগীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হচ্ছে। রোগীর কাছ থেকে টাকা নেওয়া হবে অথচ তার বিপরীতে রসিদ দেওয়া হবে না। এমন ব্যবস্থা কোনোভাবেই স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষ করে প্রতিটি আর্থিক লেনদেনের লিখিত প্রমাণ ও নির্ভরযোগ্য হিসাব সংরক্ষণ করা জরুরি।

দিঘীর পাড় এলাকার মিজান নামের এক যুবক তার ৮০বছরের দাদিকে এনেছিলেন বুকের এক্স-রে করাতে। এজন্য তাকে দিতে হয় ২০০ টাকা। কিন্তু টাকা নেওয়া হলেও দেওয়া হয়নি কোনো রসিদ। একইভাবে ৭০বছরের নিজাম নামের এক ব্যক্তি ২০০টাকা দিয়ে পায়ের এক্স-রে করিয়েছেন, কিন্তু তাকেও দেওয়া হয়নি রসিদ এবং আজিমদ্দিন নামের আরেক ব্যক্তির কাছ থেকেও এক্স-রের জন্য ২০০ টাকা নেওয়া হলেও কোনো রশিদ দেওয়া হয়নি।

মিজান নামের ওই যুবক জানান, তাকে বলা হয়েছিল পরে রসিদ দেওয়া হবে। কিন্তু রসিদ না পেয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষ্য, দুইশ টাকা নিয়েছে, রসিদ তো অবশ্যই দেওয়া উচিত ছিল। রশিদ না দিলে এই টাকা কোথায় যাচ্ছে, তার কোনো হিসাব থাকবে না।

পড়ে গিয়ে হাতে ব্যাথা পায় হরিশপুরের ৭০বছরের রিজিয়া। তিনি এক্স-রে করেছেন ২১০ টাকা দিয়ে। ৫৫ বছরের পারুলও হাতের এক্সরে করেছে একই টাকা দিয়ে। কিন্তু তাদেরও রশিদ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।

শুধু এক্স-রে নয়, আলট্রাসনোগ্রাফি বিভাগেও একই চিত্র দেখা গেছে। খবির উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি আলট্রাসনোগ্রাফি করাতে ২২০ টাকা দেন। কিন্তু তাকে কোনো রশিদ দেওয়া হয়নি। একইভাবে ফোরদৌস ও সুমি নামের দুই সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে ২২০ টাকা করে নেওয়া হলেও তাদের হাতে পৌঁছায়নি কোনো রসিদ। এমনকি এক গণমাধ্যমকর্মীর কাছ থেকেও আলট্রাসনোগ্রাফির জন্য ২২০ টাকা নেওয়া হলেও রশিদ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। আলট্রাসনোগ্রাফি কক্ষে দায়িত্বে থাকা এক নারী কর্মী এসব টাকা গ্রহণ করছিলেন বলে জানান তারা।

এদিকে সেবাগ্রহীতারা ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করার পর দুপুর প্রায় ১২টার সময় স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হাসপাতালে এসে জানালেন ১০টার বেশি আলট্রাসনোগ্রাম করা হবেনা। বেকায়দায় পড়ে যান সেবাগ্রহীতারা। অনুরোধ করার পর রাকিবুলসহ আর কয়েকজনকে করা হলো আলট্রাসনোগ্রাম। তবে তাদেরও দেওয়া হয়নি টাকা বিপরীতে কোনো রসিদ।

সেবাগ্রহীতারা বলেন, সচেতন নাগরিক হিসেবে মনে হয়েছে আমরা প্রতারিত হচ্ছি এবং সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।

রশিদ ছাড়া টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে নিজেকে টেকনিশিয়ান পরিচয় দিয়ে সবুজ বলেন, আমি এখানে প্রায় ৬বছর থেকে মাস্টাররোলে চাকরি করছি। এখানে রশিদ কেটে এক্স-রে করতে হয়। তবে জরুরি রোগীকে রশিদ ছাড়াই এক্স-রে করে দেওয়া হয়। পরে রশিদ কাটা হয়। আর দিনে সর্বোচ্চ ৫-৭টা করে এক্স-রে হয়। কারণ সবগুলো রোগী দালালরা বাহিরে নিয়ে যায়। এখানে ২১০টাকা নেওয়া হয়। আমি একটা বড় খামের জন্য ১০টাকা করে নিয়ে থাকি।

তিনি আরও বলেন, আমার এখানে সবকিছু কম্পিউটারে পোস্টিং দেওয়া হয়। পরবর্তীতে রশিদ কাটা হয়। একসময় তিনি বলেন, এই কম্পিউটার একবার বন্ধ হলে আর কোনো ডকুমেন্টস থাকে না, সব ডিলিট হয়ে যায়।

তার এসব কথাতে সন্দেহের মাত্রা আরও বেশি হয়ে উঠে। কারণ এক্স-রের প্রকৃত সংখ্যা, রোগীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ এবং জমা দেওয়া টাকার হিসাব সংরক্ষণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তথ্য সংরক্ষণের স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকলে প্রতিদিন কতটি এক্স-রে হচ্ছে এবং কত টাকা আদায় ও জমা হচ্ছে, তা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি একসময় বলেন, এখন থেকে রশিদ নিয়েই এক্স-রে করতে হবে। কারণ আমি কোনো অন্যায় পছন্দ করিনা। আর তথ্য যেন সংরক্ষিত থাকে, সে বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে জানাতেও বলেন তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রাণীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কে এইচ এম ইফতেখারুল আলম খান বলেন, আলট্রাসনোগ্রাফির ফিক্সড সময় নেই, কারণ লোক না থাকায় আমি নিজেই করি, যদিও এটা আমার কাজ না, তারপরও উপযাচক হয়ে আমি করছি। আর লোকবল কম থাকার কারণে রশিদ দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে মাস শেষে যাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়, তা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়। আর এক্স-রের জন্য আলাদা ঘর আছে, সেখানে রশিদ দেওয়া হয়।

সঠিকভাবে টাকা জমা হয় কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সকল টাকাই রাজস্বখাতে জমা দেওয়া হয়। স্টোর কিপার সাদেকুল, টেকনিশিয়ান সবুজ ও আপনি মিলে নয়ছয় করছেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এগুলো আপনারা তদন্ত করেন, মনগড়া কথা শুনে রিপোর্ট করবেন না। কারণ আমাদের যথেষ্ঠ রিপোর্ট আছে।

তিনি একসময় বলেন, আপনারা যদি এটাকে ভুল মনে করেন, তাহলে আমি আলট্রাসনোগ্রাফি বন্ধ করে দেব। রোগীর যা হবে হোক। কারণ লোকবল সংকট থাকার কারণে জনস্বার্থে আমি নিজেই আলট্রা করে দিই। লোকবল নেই, তাই রসিদ দেওয়ার আমার সময় নেই, আলট্রা করি এটাই বেশি।

এ বিষয়ে নওগাঁর ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মুনির আলী আকন্দ বলেন, রশিদের বাইরে কোনো ধরনের সেবা গ্রহণের নিয়ম নেই। রশিদ কেটেই সেবা নিতে হবে। রোগীদের কাছ থেকে রশিদ ছাড়াই এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফির জন্য টাকা নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমরা বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবো।

সচেতনদের দাবি, রাণীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফির নামে আদায় করা অর্থের প্রকৃত হিসাব, প্রতিদিনের পরীক্ষার সংখ্যা, রসিদ বই, কম্পিউটার ডেটা, ক্যাশবুক এবং সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া অর্থের তথ্য নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আউটসোর্সিং কর্মী, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং অর্থ জমার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।

এদিকে জনশ্রুতি আছে ডা. কে এইচ এম ইফতেখারুল আলম খান উপজেলার এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই প্রায় ৭বছর ধরে চাকরি করছেন। পদোন্নতি হলেও একই প্রতিষ্ঠানে আছেন। আবার থাকার জন্য তদবিরও করেন। অপরদিকে একই সময় ধরে চাকরি করছেন স্টোর কিপার সাদেকুল ইসলাম। তারও আছে বিভিন্ন অনিয়ম। আবার আউটসোর্সিং এ ৬বছর চাকরি করছেন টেকনিশিয়ান সবুজ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category