বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দল নয়, এটি ফ্যাসিস্টদের একটি ক্লাব। তারা যখনই বিভিন্ন কায়দায় সন্ত্রাস করে ক্ষমতায় গিয়েছে, তখনই বেপরোয়া হত্যা ও সন্ত্রাস চালিয়ে গদি পাকাপোক্ত করতে চেয়েছে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ক্ষমতা গ্রহণ করে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত তারা এ জাতির ওপর সমানতালে তাণ্ডব, লুটপাট, চাঁদাবাজি ও অরাজকতা চালিয়েছে। স্বাধীন দেশে ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধাসহ প্রায় ৩৫ থেকে ৩৭ হাজার মানুষকে হত্যা করা হলেও তাদের কাউকেই বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি; বরং রক্ষীবাহিনী গঠন করে তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।’
মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর আইডিইবি ভবনের মাল্টিপারপাস হলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর রাজধানীর পল্টনে আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠার তাণ্ডবে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জামায়াত আমীর।
শেখ হাসিনার তৎকালীন ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু তার রক্তের নেশা কাটেনি। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘আমার দলের একটি লাশ পড়লে ১০টি লাশ ফেলতে হবে।’ শাসক হয়ে জনগণকে খুন করার সরাসরি নির্দেশ দেওয়ার ধৃষ্টতা ফ্যাসিবাদী ঐতিহ্যের কারণেই তিনি দেখিয়েছিলেন।’
ডা. শফিকুর রহমান আরো বলেন, ‘২০০১ সালে জনগণের বিপুল সমর্থনে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসে। তবে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগ রাজপথে লগি-বৈঠা নিয়ে তাণ্ডব চালায়। মানুষ পিটিয়ে হত্যা করার জন্য লগি-বৈঠা আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আমাদের সহকর্মীদের হত্যা করে লাশের ওপর তাণ্ডব চালানো হয়েছে, এমনকি লাশ চুরি করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সেদিন বাংলাদেশ পথ হারিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্যাসিবাদের মুখে পড়েছিল।’
তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ও পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড ঘটলেও তারা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মামলা প্রত্যাহারের পাশাপাশি সব আলামত ও নথিপত্র গায়েব করে ফেলে। তবে অন্যায়ভাবে জামায়াত নেতাদের হত্যার ফল আওয়ামী লীগকে ভোগ করতেই হবে। তারা এসব অপরাধ থেকে পার পাবে না, আমরা এ বিচারের শেষ দেখে ছাড়ব।’
বর্তমান পরিস্থিতি ও সরকার প্রসঙ্গে জামায়াত আমীর বলেন, ‘আমরা কোনো ফ্যাসিবাদের হাতে বাংলাদেশকে ইজারা দেব না। দেশে আর কোনোদিন ফ্যাসিবাদের রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হবে না। সংবিধান নিয়ে খেয়ালখুশিমতো সিদ্ধান্ত না নিয়ে একটি গণপরিষদ গঠন করে সংবিধান সংস্কার করার জন্য বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’
আলোচনা সভায় জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘পল্টন মোড়ে প্রকাশ্য দিবালোকে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে মানুষ হত্যা এবং লাশের ওপর নৃত্য করার মতো নৃশংস ইতিহাস মানবজাতির জন্য কলঙ্কজনক। আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দল নয়, এটি একটি সন্ত্রাসী সংগঠন।’
সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আওয়ামী লীগের চরিত্রই হলো ক্ষমতার বাইরে গিয়ে গণতন্ত্রের কথা বলা এবং ক্ষমতায় বসে তা হত্যা করা। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি যেমন বাকশাল কায়েম করে গণতন্ত্র হত্যা করা হয়েছিল, তেমনি লগি-বৈঠার তাণ্ডব, পিলখানা ও শাপলা চত্বরের গণহত্যার মাধ্যমে সেই ধারা বজায় রাখা হয়েছে।’
এ সময় তিনি অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে বলেন, ‘চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে গাদ্দারি করে পুনরায় ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটার চেষ্টা করলে একই পরিণতি বরণ করতে হবে।’
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি এবং ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিমের সঞ্চালনায় আলোচনা ও মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম এমপি, সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি ও মাওলানা আবদুল হালিম, এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের; কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি এবং ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।
এছাড়াও বক্তব্য রাখেন ২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর ফ্যাসিস্ট হাসিনার লগি-বৈঠার তাণ্ডবে শহীদ হাফেজ গোলাম কিবরিয়া শিপনের পিতা মো. তাজুল ইসলাম, শহীদ মুজাহিদুল ইসলামের মামা বিশিষ্ট সংবাদকর্মী মিজান আহম্মেদ, শহীদ সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুমের মাতা শামছুন্নাহার রুমি, শহীদ হাবিবুর রহমান মৃধার সন্তান রুবেল মৃধা, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি কামাল হোসেন এমপি, হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এমপি, জয়নুল আবেদীন এমপি এবং ডাকসুর সাবেক ভিপি আবু সাদিক কায়েম। দোয়া পরিচালনা করেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি।