পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমন ভালভের (পিওআরভি/পিওএসভি) সব পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রথম ধাপে ১৬ দশমিক ১ এমপিএ (মেগাপ্যাসকেল) পরিচালন চাপ এবং ২৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বজায় রেখে ১২টি পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়। পরবর্তী ধাপে ১৮ দশমিক ৬৫ এমপিএ চাপের পরীক্ষায় প্রাথমিকভাবে সমস্যা দেখা দিলেও পরে সেটিও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
এর ফলে আগামী ডিসেম্বরের শেষে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। গতকাল বুধবার রাতে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এসব তথ্য জানিয়েছেন।
ভালভে সমস্যা দেখা দেওয়ার পর তা মেরামতের জন্য নির্মাণ সহযোগী দেশ রাশিয়ার সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ। এরপর মস্কো থেকে রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ দল রূপপুরে এলে একে একে নয়টি ভালভ মেরামত করা হয়। মেরামত শেষে শুরু হয় বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পরবর্তী ধাপে ১৮ দশমিক ৬৫ এমপিএ চাপে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভালভ দুটি একসঙ্গে খুলে অতিরিক্ত চাপ নির্গত করে প্ল্যান্টকে নিরাপদ রাখার কথা। তবে নির্ধারিত চাপের এই পরীক্ষায় প্রাথমিকভাবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভালভ দুটি খুলতে ব্যর্থ হয়। ফলে পরীক্ষাটি সফলতার নির্ধারিত মানদণ্ডে পৌঁছাতে প্রথমে কিছুটা সমস্যা দেখা দেয়। চাপ ১৮ দশমিক ১ এমপিএ -তে পৌঁছালে তিনটি ভালভের মধ্যে প্রথম ভালভটি খুলে অতিরিক্ত চাপ নির্গত করে প্ল্যান্টকে নিরাপদ রাখার কথা। এই পরীক্ষাটিও এরই মধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে এনপিসিবিএলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সব প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পন্ন হলে আগামী ডিসেম্বরের শেষে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, কেন্দ্রটির প্রধান নিয়ন্ত্রণকক্ষ (এমসিআর) ও জরুরি নিয়ন্ত্রণকক্ষ (ইসিআর)—দুই জায়গা থেকেই পরীক্ষাগুলো পরিচালনা করা হয়। এতে প্রথম ইউনিটের চাপ নিয়ন্ত্রণ ও অতিরিক্ত চাপ কমানোর সব পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। ভালভ খোলা ও বন্ধ হওয়ার সময়, সাড়া দেওয়ার গতি, সতর্কসংকেত এবং বিভিন্ন কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় চাপ ও তাপমাত্রার তথ্য পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবী, এখন রূপপুরের সামনে বড় মাইলফলক হলো ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এই ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি শুরুর জন্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়রা) অনুমতি প্রয়োজন। বায়রার অনুমতি পাওয়ার পর রিঅ্যাক্টরে একটি স্থিতিশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হবে। এর মাধ্যমে রিঅ্যাক্টর একটি স্থির অবস্থা থেকে সক্রিয় অপারেশনাল পারমাণবিক স্থাপনায় রূপান্তরের আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে প্রবেশ করবে।
পরমাণু বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরকে তার পূর্ণ নির্ধারিত তাপীয় ক্ষমতার এক শতাংশেরও কম শক্তিস্তরে পরিচালনা করে ‘ইনিশিয়াল ক্রিটিক্যালিটি’ বা প্রাথমিক ক্রিটিক্যালিটিতে নেওয়া হবে। এ পর্যায়েই শুরু হবে প্রথম স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন বা ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি। এ সময় রিঅ্যাক্টরের গুরুত্বপূর্ণ পরামিতি, বিভিন্ন সিস্টেম, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের কার্যকারিতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও যাচাই করা হবে। ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটিসহ পুরো ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ প্রক্রিয়ায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগতে পারে। পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক হলে ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়ানো হবে।
ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ শেষ হওয়ার পর প্রকল্পটি ‘পাওয়ার স্টার্ট-আপ’ পর্যায়ে প্রবেশ করবে। এ পর্যায়ে ধীরে ধীরে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়ানো, টারবাইন সিনক্রোনাইজেশন এবং শেষ পর্যন্ত জেনারেটরকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করার কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
এজন্য অপারেটিং অর্গানাইজেশনকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়রা) কাছ থেকে ট্রায়াল অপারেশনাল লাইসেন্স নিতে হবে।