পাহাড়-টিলা কেটে তৈরি হচ্ছে কক্ষ, সমান করা হচ্ছে টিলা, বসানো হচ্ছে কংক্রিটের স্থাপনা। কোথাও বনাঞ্চল ঘেঁষে গড়ে উঠছে কটেজ, কোথাও সবুজের বুক চিরে তৈরি হচ্ছে রিসোর্টের রাস্তা। পর্যটনের নামে কমলগঞ্জের প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য বদলে ফেলার এমন অভিযোগ বাড়লেও এসব স্থাপনার জমির মালিকানা, নির্মাণ অনুমোদন ও পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়ে নেই পূর্ণাঙ্গ হিসাব।
কমলগঞ্জের মাধবপুর, কমলগঞ্জ সদর ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েক বছরে রিসোর্ট-কটেজের বিস্তার ঘটেছে। টিলাগাঁও ইকো ভিলেজ, আম্বার উড ইকো রিসোর্ট, বেকইয়ার্ড রিট্রেট, কারাঞ্জা স্পা রিসোর্ট, সাউন্ড অব সাইলেন্স, স্বপ্নটিলা ইকো রিসোর্ট ও অরণ্য নিবাসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম স্থানীয়ভাবে আলোচনায় রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েকটি স্থাপনা টিলা, বনাঞ্চল বা বনাঞ্চলসংলগ্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে। কোথাও নির্মাণকাজ এখনও চলছে। নুরজাহান সড়কসংলগ্ন বনাঞ্চলের কাছাকাছি এলাকাতেও নতুন নতুন কটেজ ও পর্যটন স্থাপনা গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে। ফলে এসব স্থাপনার জমির শ্রেণি, মালিকানা, নির্মাণ অনুমোদন ও পরিবেশগত ছাড়পত্র যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
সরকারি জমি নিয়েও প্রশ্ন
রিসোর্ট ব্যবসায় সরকারি খাসজমি কিংবা বন বিভাগের জমি ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। তবে কোন প্রতিষ্ঠানের জমি সরকারি, কোনটি ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং কোনটির বিরুদ্ধে দখলের অভিযোগ রয়েছে এ বিষয়ে জেলা পর্যায়ে সমন্বিত তথ্য নেই।
এদিকে, ছোট পরিসরের জমিতে কয়েকটি কক্ষ নির্মাণ করে রিসোর্ট বা কটেজ হিসেবে পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে অতিথিদের নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রশাসনের কাছেই নেই পূর্ণাঙ্গ হিসাব
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সন্দ্বীপ তালুকদার বলেন, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা রিসোর্ট ও পর্যটন স্থাপনাগুলোর জমির মালিকানা, নির্মাণ অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্রসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যাচাই করে দেখা প্রয়োজন। কোনো স্থাপনা সরকারি জমি, বনভূমি বা পরিবেশের ক্ষতি করে নির্মাণ করা হয়েছে, এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য বা অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সমন্বয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম বলেন, “জেলায় প্রায় ৬০টি রিসোর্ট পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র নিয়েছে। অন্যগুলোর অনুমোদনের বিষয়ে আমাদের কাছে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই।
জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, জেলা প্রশাসন মূলত পাঁচ তারকা ও তিন তারকা মানের হোটেল-রিসোর্টের বিষয়গুলো দেখে। ছোটখাটো রিসোর্টগুলো অনুমোদন নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য আমাদের কাছে নেই।
পরিবেশবাদী সাংবাদিক নুরুল মোহাইমিন মিল্টন বলেন, “পাহাড়-টিলা কেটে কিংবা প্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট করে পর্যটন স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। রিসোর্ট ব্যবসার জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা দরকার।”
কমলগঞ্জের দ্রুত বিস্তৃত রিসোর্ট ব্যবসার মধ্যে তাই প্রশ্ন উঠছে এসব স্থাপনা ঠিক কোন জমিতে, কী অনুমোদনে এবং পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলে গড়ে উঠছে? প্রশাসনের কাছেই যখন এসবের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই, তখন কমলগঞ্জের টিলা ও বনাঞ্চল রক্ষায় নজরদারি কতটা কার্যকর সেটিও এখন বড় প্রশ্ন।