• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪০ অপরাহ্ন
Headline
নলডাঙ্গায় বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস পালিত, গুরুত্ব পেল জনসচেতনতা যুবদলের ৪৮ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী মাহমুদুল আলমের উদ্যোগে প্রতিবন্ধীদের মাঝে হুইল চেয়ার, সেলাই মেশিন ও ক্রাচ বিতরণ সান্তাহার পৌর যুবদলের উদ্যোগে নানা আয়োজনে ৪৮ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালিত দুই বছরের মধ্যে স্বাস্থ্যখাতে আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্য: স্বাস্থ্যমন্ত্রী বাংলাদেশের ৫ অগ্রাধিকার খাতে জাপানি বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে: রাষ্ট্রপতি  বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে সুইজারল্যান্ডের প্রতি রাষ্ট্রপতির আহ্বান বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণে জাপানের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী  বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে আগ্রহী জাপান উন্নত বাংলাদেশ গড়তে প্রবাসী-দেশবাসীকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

নিরাপদ শহর, সমৃদ্ধ অর্থনীতি

আবদুল্লাহ আল মামুন, ব্যাংকক থাইল্যান্ড / ৩১ Time View
Update : বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

‎*এক দশকের! অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ৮৯ শতাংশ এসেছে নগরাঞ্চল থেকে: বিশ্বব্যাংক

‎*২০২৫ সালে ব্যাংককে প্রায় ১ কোটি ৪১ লাখ পর্যটক ও ভ্রমণকারী

‎*নিরাপত্তায় এআই ক্যামেরা, ২৪ ঘণ্টার হটলাইন ও বহুভাষিক সহায়তা

‎*পর্যটকের আস্থা ধরে রাখতে নতুন উদ্যোগ, চ্যালেঞ্জ রয়েছে

‎ব্যস্ত সড়ক, আধুনিক গণপরিবহন, বহুতল বাণিজ্যিক ভবন, আন্তর্জাতিক মানের হোটেল, বিপণিবিতান রাত পর্যন্ত সচল জনজীবন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরকেন্দ্র থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক। এখানে পর্যটন, ব্যবসা, পরিবহন, আবাসন ও সেবাখাতের বিস্তৃত কর্মকাণ্ড শহরটির অর্থনীতিকে গতিশীল রেখেছে। তবে, একটি শহরের অর্থনৈতিক সাফল্যের পেছনে শুধু উন্নত অবকাঠামো কিংবা আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রই কাজ করে না, মানুষের নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং প্রশাসনের ওপর আস্থা সমান গুরুত্বপূর্ণ।

‎ব্যাংককের অভিজ্ঞতা বলছে, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। মানুষ নিরাপদে চলাচল করতে পারলে ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক থাকে, পর্যটকেরা অর্থ ব্যয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন এবং উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশ পান। অন্যদিকে অপরাধ, প্রতারণা কিংবা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে একটি শহরের সুনাম ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

‎বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে থাইল্যান্ডের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির প্রায় ৮৯ শতাংশ এসেছে নগরাঞ্চল থেকে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক আসে ব্যাংকক থেকে। অর্থাৎ রাজধানীর উৎপাদনশীলতা ও নগর ব্যবস্থাপনার উন্নতি জাতীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংককের এই অর্থনৈতিক গুরুত্বের সঙ্গে যানজট, অবকাঠামোর ওপর চাপ এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি রয়েছে।

‎’যানজটের কারণে প্রতিবছর ব্যাংককের মোট আঞ্চলিক উৎপাদনের আনুমানিক ৭ থেকে ১০ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। এই পরিসংখ্যান দেখায়, একটি শহরকে নিরাপদ করার পাশাপাশি দক্ষ, বাসযোগ্য ও গতিশীল করে তোলা অর্থনৈতিক উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ।’

‎পর্যটনের প্রাণকেন্দ্র ব্যাংকক:
‎থাইল্যান্ডের অর্থনীতিতে পর্যটন একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস। দেশটির পর্যটন ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে থাইল্যান্ডে আন্তর্জাতিক পর্যটক এসেছেন ৩ কোটি ২৯ লাখ ৭০ হাজার। তাঁদের কাছ থেকে আয় হয়েছে প্রায় ১.৫৪ ট্রিলিয়ন বাত। একই বছরে অভ্যন্তরীণ পর্যটনসহ দেশটির মোট পর্যটন আয় ছিল প্রায় ২.৭ ট্রিলিয়ন বাত। তবে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা কমেছে ৭.২৩ শতাংশ এবং মোট পর্যটন আয় কমেছে ১.২৬ শতাংশ। অর্থাৎ বিপুল পর্যটন অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও পর্যটকের সংখ্যা ও আয় ধরে রাখা থাইল্যান্ডের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।ব্যাংককের নিজস্ব পরিসংখ্যানও একই ধরনের বাস্তবতা তুলে ধরে।

‎এদিকে, থাইল্যান্ডের জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের Bangkok Statistical Data 2025 অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ব্যাংককে আসা ভ্রমণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৪১ লাখ, যা ২০২৪ সালের প্রায় ১ কোটি ৪৪ লাখের তুলনায় ২.২৮ শতাংশ কম। এর মধ্যে রাতযাপনকারী ভ্রমণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৮ লাখ। ব্যাংককে রাতযাপনকারী বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা আগের বছরের ৬৯ লাখ ৫০ হাজার থেকে কমে প্রায় ৬৬ লাখ ৯০ হাজারে দাঁড়ায়।

‎নিরাপত্তা জোরদারে প্রযুক্তি ও সমন্বিত উদ্যোগ:
‎পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে থাইল্যান্ডের পর্যটন পুলিশ প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং বহুভাষিক সহায়তার ব্যবস্থা জোরদার করেছে। থাইল্যান্ডের পর্যটন পুলিশের ২ অক্টোবর ২০২৫-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর তথ্যভান্ডারের সঙ্গে সংযুক্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরা ব্যবস্থার সহায়তায় ৫০০-এর বেশি পরোয়ানাভুক্ত সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। পর্যটনকেন্দ্রে অপরাধ প্রতিরোধ এবং অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা জানায় কর্তৃপক্ষ।

‎পর্যটকদের জরুরি সহায়তার জন্য রয়েছে ১১৫৫ নম্বরে পর্যটন পুলিশের হটলাইন এবং Thailand Tourist Police অ্যাপ। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, অ্যাপটি আটটি ভাষায় সহায়তা দিতে পারে এবং এতে জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগের জন্য এসওএস সুবিধা রয়েছে। এছাড়াও, ২০২৫ সালে চালু করা Trusted Thailand উদ্যোগের মাধ্যমে পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা ও সেবার মান উন্নত করার চেষ্টা চলছে। ২০২৬ সালের মে মাসে থাইল্যান্ডের পর্যটন কর্তৃপক্ষ উদ্যোগটি জোরদারের কথা জানায়। হোটেল, রেস্তোরাঁ, বিপণিবিতান ও পর্যটনকেন্দ্রে নিরাপত্তা এবং সেবার মান সম্পর্কে আস্থা তৈরিই এর অন্যতম লক্ষ্য।

‎থাইল্যান্ড নিয়ে বিশ্বব্যাংকের ভাবনা:
‎আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সম্মেলন থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মেগা অনুষ্ঠানে বিশ্বের ১৯০টি দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ প্রতিনিধিরা অংশগ্রহন করেছেন। আইএমএফ এর এ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ব্যাংককসহ পুরো দেশ জুড়ে সর্বোচ্চ স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে থাইল্যান্ড রয়্যাল পুলিশ ও ব্যাংকক মেট্রোপলিটন পুলিশ।
‎
‎​বিশ্বনেতা ও আন্তর্জাতিক অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে এবং পুরো রাজধানীতে ট্রাফিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে থাই কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থা চালু করেছে। ১০ অক্টোবর থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত সম্মেলনের প্রধান ভেন্যু ও ভিআইপি হোটেলগুলোর ১০০ মিটারের মধ্যে সব ধরনের জনসভা, মিছিল বা বিক্ষোভ সমাবেশ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ব্যাংককের কেন্দ্রস্থলে তীব্র যানজট এড়াতে এবং ভিআইপি কনভয় চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করতে ‘ট্রাফিক কন্ট্রোল অ্যান্ড কমান্ড সেন্টার (1197)’ এবং ট্রাফিক পুলিশ নির্দেশিকা জারি করেছে। ট্রাফিক ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে ব্যাংকক সিটি কর্পোরেশন নির্দিষ্ট দিনগুলোতে সরকারি কর্মচারীদের জন্য ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ এবং ১৬ অক্টোবর বিশেষ ছুটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে।

‎বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ;
‎বিশ্বব্যাংকের থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার বিভাগের পরিচালক স্টিফেন এন. এনদেগওয়া ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত নগর অর্থনীতি বিষয়ক প্রতিবেদনে বলেছেন, ভবিষ্যতের থাই শহর গড়ে তোলা কেবল নগর পরিকল্পনার বিষয় নয়, এটি প্রবৃদ্ধি, প্রতিযোগিতা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতার বিষয়।

‎বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের এই বিশ্লেষণ ব্যাংককের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ একটি আন্তর্জাতিক নগরকেন্দ্রের উৎপাদনশীলতা শুধু কারখানা, অফিস কিংবা বাণিজ্যিক ভবনের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। কর্মী কতটা নিরাপদে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন, ব্যবসা কতটা নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয় এবং বিদেশি গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীরা কতটা আস্থা পান এসব বিষয় সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতার অংশ।

‎একই প্রতিবেদনে পরিকল্পনা ও কৌশলগত ব্যবস্থাপনা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ড. পুন থিয়েংবুরানাথুম বিনিয়োগকে আরও কৌশলগতভাবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শহরের অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবকাঠামো ও সেবা উন্নয়ন করা হলে নগর বিনিয়োগ থেকে বেশি সুফল পাওয়া সম্ভব।

‎থাইল্যান্ডের পর্যটন কর্তৃপক্ষের গভর্নর থাপানি কিয়াতফাইবুল ২০২৬ সালের মে মাসে Trusted Thailand উদ্যোগ নিয়ে বক্তব্যে পর্যটকদের আস্থাকে দেশটির দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন প্রতিযোগিতার জন্য অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে ফুটে ওঠে, নিরাপত্তা, ন্যায্যতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও টেকসই সেবাকে পর্যটকের পুরো ভ্রমণ-অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category