টেস্টে বাংলাদেশের গল্পটা এতদিন ছিল অপেক্ষার। অভিষেকের ২৬ বছর পেরিয়েও এই সংস্করণে বড় দলগুলোর মতো ধারাবাহিক আধিপত্য দেখাতে পারেনি টাইগাররা। এবার সেই গল্প বদলানোর স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের চলতি চক্রে চতুর্থ স্থানে থাকা দলটির সামনে এখন ফাইনালের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। আর সেই সম্ভাবনাকে স্বপ্নে রূপ দিয়েছেন ডারউইন টেস্টের নায়ক হাসান মাহমুদ।
গত দুই বছরে ১৩ টেস্টে বাংলাদেশের জয় ছয়টি। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ডারউইনে পাওয়া জয়টি ছিল বিশেষ কিছু। দুই ম্যাচের সিরিজ ১-১-এ শেষ হলেও সেই জয় বাংলাদেশকে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলে চতুর্থ স্থানে তুলে দিয়েছে। পেছনে ফেলেছে ভারতকেও।
সামনে এখনো ছয়টি টেস্ট। ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চারটি, দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে আরও দুটি। সমীকরণ কঠিন হলেও অসম্ভব নয়-বিশেষ করে ঘরের চার ম্যাচে পূর্ণ পয়েন্ট পেলে। সেই সম্ভাবনাই এখন বড় স্বপ্ন হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের পেসারের কাছে।
বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাসান বলেছেন, ‘আমাদের দিকে মোমেন্টাম আসছে, অবশ্যই। এখন পরিবেশটাই এমন যে, বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটে আধিপত্য করতে পারে।’
ডারউইনে সেই আত্মবিশ্বাসের বড় প্রমাণও দিয়েছিলেন হাসান। ঐতিহাসিক জয়ের ম্যাচে ৫৫ রানে নিয়েছিলেন ৬ উইকেট। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের জয়ের অন্যতম নায়ক হয়ে ওঠা সেই পারফরম্যান্স যেন তাঁকেও নতুন করে বিশ্বাস করিয়েছে-বাংলাদেশ চাইলে টেস্টের বড় মঞ্চে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারে।
সেই বিশ্বাস থেকেই ফাইনালের স্বপ্ন দেখছেন তিনি। হাসান বলছিলেন, ‘আমরা যদি ঘরের মাঠে চারটি ম্যাচ জিততে পারি, তাহলে কেন আমরা বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলতে পারব না? এখন বাংলাদেশের জন্য সেটাই স্বপ্ন।’
বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে পরিবর্তনের আরেকটি জায়গা অবশ্যই পেস বোলিং। একসময় দেশের টেস্ট দলে পেস আক্রমণ নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এখন হাসান, তাসকিন আহমেদ, শরিফুল ইসলামদের মতো পেসাররা নিয়মিতই নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিচ্ছেন। হাসানের চোখে, এই পরিবর্তনটা শুধু বাংলাদেশের ভেতরের আলোচনা নয়; বিশ্ব ক্রিকেটও তা দেখতে শুরু করেছে, ‘তারা এখন বুঝতে পারছে, বাংলাদেশেরও ভালো মানের ফাস্ট বোলার আছে, যারা বিশ্বমানের হতে পারে।’
ডারউইনে নিজের সাফল্যের গল্পটাও হাসান বলেছেন সরলভাবে। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের বিপক্ষে আলাদা কোনো চমক নয়, নিজের পরিকল্পনায় অটল থাকাই ছিল তার অস্ত্র। ‘আমি শুধু নিজের কাজ করে যাচ্ছিলাম এবং বোলিং করছিলাম। তাদের সহজে মারার মতো কিছু দিইনি। শর্ট বল দিয়ে আক্রমণ করেছি এবং নিজের মতো করে বোলিং করে গেছি। তারা আমাকে মারলে মারুক।’
এই মানসিকতাটাই যেন বাংলাদেশের নতুন টেস্ট ভাবনার প্রতিচ্ছবি। প্রতিপক্ষ যত বড়ই হোক, নিজেদের শক্তির জায়গায় আস্থা রেখে লড়াই করার চেষ্টা। হাসানের মতে, নিয়মিত টেস্ট খেলার সুযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দলের মানসিকতাতেও এসেছে পরিবর্তন, ‘আমরা যখন থেকে নিয়মিত খেলা শুরু করেছি, তখন থেকেই দলের মানসিকতায় বড় পরিবর্তন এসেছে। বিশ্ব ক্রিকেটও এখন স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে যে বাংলাদেশেও বৈশ্বিক মানের পেসার উঠে আসছে।’
শুধু পেসারদের উত্থান নয়, দল হিসেবে বাংলাদেশের উন্নতিকেও সামনে রাখছেন হাসান। তার বিশ্বাস, পেসাররা ফিট থাকলে এবং ব্যাটাররা নিয়মিত রান পেলে বাংলাদেশ খুব দ্রুতই আরও উঁচুতে উঠতে পারে, ‘টেস্টে দল হিসেবে আমাদের কতটুকু উন্নতি হয়েছে, তা স্পষ্ট। পেসাররা যদি ফিট থাকে আর ব্যাটাররা রান পেয়ে যায়, তবে খুব দ্রুতই আমরা ক্রিকেটের আরও উচ্চ স্তরে পৌঁছে যাব।’
ডারউইনের জয় হয়তো একটি ম্যাচের গল্প। কিন্তু টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিল বলছে, সেই জয়ের প্রভাবটা অনেক দূর পর্যন্ত গেছে। চতুর্থ স্থানে থাকা বাংলাদেশ এখন আর শুধু একটি ভালো সিরিজের অপেক্ষায় নেই। সামনে তাকিয়ে আছে বড় এক লক্ষ্যে। ২৬ বছর পর টেস্টে নিজেদের নতুন পরিচয় গড়ার সেই যাত্রায় হাসানের বিশ্বাস-সময়টা এবার বাংলাদেশেরই।