‘আমি শুধু আমার জমির জন্য সার চাইতে গিয়েছিলাম। হট্টগোলও করিনি। কাউকে মারিনি। কিন্তু আমার নামে মামলা হলো। পুলিশ ধরল। জীবনে থানা-পুলিশ, জেলখানা দেখি নাই। সেই জেলও খাটলাম আট দিন। সরকার আমাক এই প্রতিদান দিল। সরকারের কাছে চাইলাম সার আর সরকার খাওয়াইলো জেলের ভাত। এই ছিল কী কৃষকের কপালে।’
কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীর গনাইরকুটি গ্রামের কৃষক আল-আমিন মোল্লা (৪৭)। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে করা মামলায় আট দিন কারাগারে ছিলেন তিনি।
সম্প্রতি কুড়িগ্রামে শুধু সার সংকটই নয়, সার মজুদ ও বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। ডিলারদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন কৃষকরা। এ নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে কৃষকদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। শেষ পর্যন্ত সারের দাবিতে আন্দোলন ও সংঘর্ষের ঘটনায় কৃষকদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা।
আল-আমিনের দাবি, কৃষকদের হয়রানি করতেই তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
আল-আমিন মোল্লার স্ত্রী রওশান আরা বেগম জানান, স্বামীকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে তাকে প্রায় ২০ হাজার টাকা ঋণ করতে হয়েছে। বর্তমানে তাদের দেড় বিঘা জমিতে আমন ধান রয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে মামলার হাজিরা ও আদালতের খরচ নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি।
একই মামলায় আট দিন কারাভোগ করেছেন কৃষক সুরুজ মিয়া (৪০)।
তার ভাষ্য, ‘আমি সার নিতে গেছি। কিন্তু মারামারি বা গন্ডগোলের সময় ছিলাম না। সার তো পাই নাই। উল্টো পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে গেছে। আট দিন জেল খেটে বের হইছি। আমি গরিব মানুষ। জামিন নিতে গেছে অনেক টাকা। এখন মামলার হাজিরা দিতে যাওয়ার টাকা কই পামু। আমরা এই হয়রানি থেকে রেহাই চাই।’
মামলার নথিপত্র থেকে জানা গেছে, গত ৭ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টার দিকে ভূরুঙ্গামারীর বঙ্গ সোনাহাট ইউনিয়নের শহীদ মোড় এলাকায় বিএডিসি সার ডিলার আমজাদ হোসেনের মেসার্স আফি সার ঘরে সার বিতরণের সময় হট্টগোলের ঘটনা ঘটে।
তখন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল জব্বারকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে। ওই দিন রাতেই এই কৃষি কর্মকর্তা বাদী হয়ে ভূরুঙ্গামারী থানায় মামলা করেন। মামলায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়।
মামলার পর ঘটনার দিন রাতেই গনাইরকুটি গ্রামের সুলতান মিয়া, সুরুজ মিয়া ও আল-আমিনকে আটক করে পুলিশ। এদের মধ্যে সুলতান মিয়াকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সুরুজ মিয়া ও আল-আমিনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে ৮ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রাম আদালতে পাঠানো হয়। আদালত তাদের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠান।
কৃষকদের অভিযোগ, সার চাইতে গিয়ে তাদের মামলার আসামি করা হয়েছে।
অন্যদিকে কৃষি কর্মকর্তা আবদুল জব্বারের দাবি, তাকে অবরুদ্ধ ও মারধরের ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহলের কয়েকজন মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গনাইরকুটি গ্রামের একাধিক কৃষক জানান, মামলা হওয়ার পর ভয়ে তারা বাড়িতে থাকছেন না। রাতে পুরো গ্রাম প্রায় পুরুষশূন্য থাকে। তাদের দাবি, তারা হয়রানি থেকে মুক্তি চান।
বঙ্গ সোনাহাট ইউনিয়নের গনাইরকুটি মধ্যপাড়া গ্রামের শিউলি বেগম (৩৪)। তার স্বামী সুলতান মোল্লা।
শিউলি বেগম জানালেন, স্বামীর নাম মামলায় আসার পর থেকে তিনি বাড়িতে থাকছেন না। তাদের দেড় বিঘা জমিতে আমন ধান এবং এক বিঘা জমিতে বেগুন চাষ করা হয়েছে। তবে অনিশ্চয়তার কারণে তিনি জমিতে কাজ করতে পারছেন না।