• শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৮ পূর্বাহ্ন
Headline
বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফের মৃত্যু, হেফাজতে বন্ধু দীপ জাপান সফর শেষে ঢাকায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি, ট্রাফিক উত্তর বিভাগের কল্যাণ সভায় পুরস্কৃত হলেন সেরা পুলিশ সদস্যরা ঠাকুরগাঁও-১ উপ-নির্বাচন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীনের ভূমিধস জয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠক  ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের দাম অপরিবর্তিত থাকছে নোয়াখালীতে অস্ত্র তৈরির কারিগর গ্রেপ্তার, বন্দুক ও সরঞ্জাম উদ্ধার যুবদল আপনাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, ভাই: বিএনপি নেতাদের সহযোগিতার আহ্বান মুন্নার টয়োটার প্রথম প্রাইভেট কারে উঠলেন প্রধানমন্ত্রী মদিনার যে স্থানে নবী কারিম (সা.) তিনটি দোয়া করেছিলেন

অবহেলায় মুখ থুবড়ে পড়ছে ঈশ্বরদীর বেনারসি পল্লি

ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি / ২৬ Time View
Update : রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঈশ্বরদীর বেনারসি পল্লিতে কারখানায় কাজ করছেন কারিগররা। ছবি : সময়ের আলো
একসময় তাঁতের খটখট শব্দে মুখর থাকত পুরো এলাকা। কারিগরদের নিপুণ হাতে তৈরি বেনারসি ও কাতান শাড়ির কদর ছিল দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। সময়ের পরিক্রমায় সেই ঐতিহ্য এখন অনেকটাই ম্লান। সরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠার দুই দশক পরও পূর্ণতা পায়নি পাবনার ঈশ্বরদীর বেনারসি পল্লি। বরাদ্দ পাওয়া অধিকাংশ প্লটে গড়ে ওঠেনি কারখানা, পড়ে থাকা জায়গা ঢেকে গেছে ঝোপঝাড়ে। কমেছে তাঁত ও কারিগরদের আনাগোনাও।
ঈশ্বরদী পৌর শহরের ফতেহ মোহাম্মদপুর এলাকায় গড়ে ওঠা এ বেনারসি পল্লীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় শত বছরের তাঁতশিল্পের ইতিহাস। ব্রিটিশ আমলে ভারতের উত্তর প্রদেশ থেকে আসা বেনারসি কারিগরদের হাত ধরে এ অঞ্চলে অভিজাত শাড়ি তৈরির ঐতিহ্য গড়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে শিল্পটির বিস্তার ঘটলেও নানা সংকটে এখন টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে তাঁতিদের জন্য।
জানা গেছে, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড ২০০৪ সালে প্রায় ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে সাড়ে পাঁচ একর জায়গার ওপর বেনারসি পল্লি গড়ে তোলে। উদ্দেশ্য ছিল ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পকে পরিকল্পিতভাবে বিকশিত করা এবং তাঁতিদের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। কিস্তিতে প্লট বরাদ্দের মাধ্যমে সেখানে কারখানা স্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয় ৯০ জন তাঁতিকে।
তবে দুই দশকেও সেই পরিকল্পনার পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। বরাদ্দ পাওয়া ৯০টি প্লটের মধ্যে কারখানা গড়ে উঠেছে মাত্র সাতটিতে। বর্তমানে চালু আছে তিনটি কারখানা। অন্যদিকে অনেক প্লটে নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। কোথাও ইটের দেয়াল উঠলেও ছাদ হয়নি, আবার কোথাও কারখানার কোনো অস্তিত্বই নেই। দীর্ঘদিনের অযত্ন-অবহেলায় পল্লীর বড় একটি অংশ এখন ঝোপঝাড়ে পরিণত হয়েছে।
তাঁতিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুধু অবকাঠামোগত সমস্যাই নয়, বাজার সংকটও এ শিল্পের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েক দফায় বেড়েছে সুতা, চুমকি ও অন্যান্য তাঁতসামগ্রীর দাম। একই সময়ে কম দামের ভারতীয় শাড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দেশীয় বেনারসি ও কাতানের বাজারও সংকুচিত হয়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও শাড়ির দাম সে অনুযায়ী বাড়াতে পারছেন না তাঁতিরা।
স্থানীয় তাঁতিদের ভাষ্য, একসময় ঈশ্বরদীর ফতেহ মোহাম্মদপুর ও আশপাশের এলাকায় কয়েকশ বেনারসি তাঁত কারখানা ছিল। এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন হাজারো মানুষ। এখন অনেক কারিগর পেশা পরিবর্তন করেছেন। যাঁরা এখনও তাঁত ধরে রেখেছেন, তারাও ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
বর্তমানে বেনারসি পল্লিতে চালু থাকা কয়েকটি কারখানায় হাতে তৈরি শাড়ি উৎপাদন হচ্ছে। কারিগরদের দক্ষতায় তৈরি এসব শাড়ির দাম মান ও নকশাভেদে ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে উৎপাদন খরচও কম নয়। একটি শাড়ি তৈরিতে শ্রমিকের মজুরিই কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত পড়ে। ফলে বাজারে কম দামের শাড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে দেশীয় তাঁতিদের বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে।
স্থানীয় তাঁত ব্যবসায়ীরা জানান, কাঁচামালের দাম বাড়লেও দীর্ঘদিন ধরে বাজারে শাড়ির দাম তেমন বাড়েনি। এতে লাভ তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ অবস্থায় নতুন করে পল্লিতে কারখানা স্থাপনে আগ্রহ হারাচ্ছেন প্লট পাওয়া তাঁতিরাও।
কারখানার মালিকদের আরেকটি অভিযোগ, পল্লিতে সুতা প্রসেসিংয়ের মতো প্রয়োজনীয় সুবিধা গড়ে ওঠার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে বাইরে থেকে সুতা প্রসেস করে আনতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় ও সময়— দুটিই বাড়ছে।
শিল্পটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু প্লট বরাদ্দ করলেই ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাঁতিদের সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, কাঁচামালে সহায়তা, দক্ষ কারিগর ধরে রাখার উদ্যোগ এবং দেশীয় বেনারসি-কাতানের বাজার সম্প্রসারণ জরুরি। পাশাপাশি নকশা ও পণ্যে বৈচিত্র্য এনে নতুন প্রজন্মের ক্রেতাদের কাছে দেশীয় শাড়িকে জনপ্রিয় করার উদ্যোগও প্রয়োজন।
ঈশ্বরদী বেনারসি পল্লীর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওবায়দুর রহমান জিলানী বলেন, একসময় এখানকার বেনারসি শিল্প বেশ সমৃদ্ধ ছিল। নানা কারণে এখন শিল্পটি সংকটে পড়েছে। সরকারি সহায়তায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানো এবং দেশীয় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে পল্লিটি আবারও সচল করা সম্ভব।
তবে জনবল সংকটও পল্লীর কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, পল্লীর কার্যালয়ে প্রয়োজনীয় কর্মচারী নেই। একাই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আটঘরিয়া উপজেলার তাঁতিদের ঋণসংক্রান্ত কার্যক্রমও দেখতে হয়।
প্রায় শত বছরের ঐতিহ্য বহন করা ঈশ্বরদীর বেনারসি শিল্প এখন নানা সংকটে টিকে থাকার লড়াই করছে। একদিকে দক্ষ কারিগরের সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে বাড়তে থাকা উৎপাদন ব্যয় ও বাজার সংকট। সংশ্লিষ্টদের মতে, সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে একসময় যে শিল্পে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান ছিল, তা হারিয়ে যেতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category