ভিজিবল ফিউচারে (নিকট ভবিষ্যতে) বিদ্যুতের বিতরণ সিস্টেম বেসরকারিকরণ হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগের উপসচিব (উন্নয়ন-১) মোহাম্মদ সোলয়মান। তার এই বক্তব্য বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর বক্তব্যের ঠিক বিপরীত।
একমাস আগে (২২ জুলাই) এক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, বিদ্যুতের বিতরণ সিস্টেম বেসরকারি খাতে দিতে চাই। প্রধানমন্ত্রী সম্মতি দিয়েছেন, আমি সবাইকে প্রস্তুত হওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়ে গেলাম।
রোববার (২৩ আগস্ট) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বিদ্যুতের বিতরণ কোম্পানি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। আমি বলতে চাই ভিজিবল ফিউচারে বিদ্যুতের বিতরণ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই
অন্যদিকে এক মাস আগে মন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেছিলেন, প্রাইভেট খাতে গেলে স্বচ্ছতা বেশি থাকে, রাষ্ট্রের দায়ও কমে যাবে। আপনারা প্রস্তুত হন, বিতরণ সিস্টেমে বিনিয়োগ করার জন্য। বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা অবশ্যই প্রাইভেটে যাওয়া উচিৎ। পাশের দেশে দেখেন বিভিন্ন সিটি বিভিন্ন কোম্পানি পরিচালনা করছে। বেসরকারি খাতে দিলে, সেবার মান বাড়বে। শুধু উৎপাদন থাকবে সরকারের হাতে।
মন্ত্রীর বক্তব্যের পর বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। দেশের ছয়টি সরকারি বিতরণ প্রতিষ্ঠান পাঁচ কোটির বেশি গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে। বিতরণ ব্যবস্থা ঠিক রাখতে সারা দেশে কয়েক লাখ বিদ্যুৎকর্মী কাজ করেন। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ছাড়লে তাদের কী হবে!
দেশের উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় সবটাই কিনে নেয় পিডিবি। এরপর এই বিদ্যুৎ বিতরণকারীদের কাছে বিক্রি করা হয়। বিতরণকারী কোম্পানি গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করে বিল আদায় করে। উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত রাজশাহী ও রংপুরের শহরাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণ করে নর্দান ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো), খুলনা এবং বরিশালের ২১ জেলায় ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউট কোম্পানি (ওজোপাডিকো), ঢাকায় ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো), ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি)।
ময়মনসিংহ, সিলেট, কুমিল্লা এবং চট্টগ্রাম এলাকায় পিডিবি বিদ্যুৎ বিতরণ করে। সারা দেশের গ্রামীণ জনপদে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ৪৬২টি উপজেলায় বিদ্যুৎ বিতরণ করে। এদের কোনো প্রতিষ্ঠান লোকসান করে না। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দাম বৃদ্ধির সময় বিতরণ প্রতিষ্ঠানকে লাভ লোকসানের সমতা বিন্দুতে (ব্রেক ইভেনে) চলার মতো একটি দাম ঠিক করে দেয়। কিন্তু এরপরও বিতরণ প্রতিষ্ঠানগুলো লাভ করে থাকে। উল্টো বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যে দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করে তার ওপর প্রতি ইউনিটে সরকারকে এক শতাংশ কর দিতে হয়। এর বাইরে সরকার ভোক্তার কাছ থেকে আরও ৫ শতাংশ ভ্যাট আদায় করে।
দেশের প্রায় শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সরবরাহের আওতায় রয়েছে। অর্থাৎ সব এলাকায় সরকারি বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামো রয়েছে। প্রায় ৫০ বছর ধরে একটু একটু করে দেশের বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা সম্প্রসারিত হয়েছে। লাখ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ে বিতরণ লাইন, সাবস্টেশন, গ্রাহকের আঙ্গিনার ট্রান্সফরমারসহ বিদ্যুৎ অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। সরকারি মালিকানার বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামো এবং ব্যবস্থাপনা থাকার পরও বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার এই পরিকল্পনার বিষয়ে কোনো রূপরেখাও প্রকাশ করা হয়নি। তবে মন্ত্রী প্রকাশ্য বক্তৃতায় বলায় বিষয়টি নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে ব্যাপক আলোচনা চলছে।