বন্ধ কারখানা : পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সূত্র জানায়, তাদের ৩২৮০টি কারখানার মধ্যে ৩০০টি গ্যাসসংকটসহ বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষ করে গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, মিরপুর, ধামরাই অঞ্চলের টেক্সটাইল কারখানায় প্রয়োজনীয় চাপের অভাবে এখন সক্ষমতার অর্ধেক উৎপাদন হচ্ছে।
আর বিকেএমইএর সূত্র বলছে, তাদের সচল কারখানা ৭৫০টি। এর মধ্যে গত দুই বছরে ২২টি কারখানা গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) সূত্র বলছে, ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশে ২৩৪টি টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়। এর মধ্যে ১২১টি স্পিনিং মিল। বাকিগুলো উইভিং, ডায়িং ও অন্যান্য টেক্সটাইল। গ্যাসের অভাবে পোশাক খাত ছাড়াও সিরামিক, টায়ার, ফুটওয়্যারসহ অন্য শিল্পগুলোও এখন ধুঁকছে।
অর্থনৈতিক ক্ষতি : বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, টেক্সটাইলে ২৩ বিলিয়ন ডলার আর অ্যাক্সেসরিজে ৬ বিলিয়ন ডলার, আরএমজিতে ৪০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হয়েছে। গ্যাসসংকটের কারণে বর্তমানে মোট ৬৯ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ঝুঁকিতে আছে। আবার গ্যাসসংকট বা গ্যাস সংযোগ না থাকায় দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পাঞ্চলে বড় বড় শিল্প গোষ্ঠীর ৩০ হাজার কোটি টাকার ওপর বিনিয়োগ কোনো কাজে আসছে না।
৫৫০ কারখানার আবেদন ঝুলে আছে : জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, গ্যাস সংযোগ পেতে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে জমা আছে ১ হাজার ৮০০টি আবেদনপত্র। এ আবেদনগুলোর মধ্যে ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়ে গ্যাস সংযোগের জন্য চার থেকে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে অপেক্ষায় আছে দেশের ৫৫০-এর ওপর শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে আছে স্টিল প্ল্যান্ট, তৈরি পোশাক কারখানা, সিমেন্ট কারখানা।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম গতকাল বলেন, গ্যাসসংকটের জন্য এরই মধ্যে কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আর বাকিগুলো ধুঁকছে। গ্যাসসংকট হলে রপ্তানি ব্যাহত হয়, দেরিতে পণ্য দেওয়া ও শর্ট শিপমেন্টের কারণে ব্যবসার ক্ষতি হয়। কিছু ক্ষেত্রে ক্রেতাকে দেরিতে পণ্য দেওয়ার জন্য ২০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিতে হয়। সব মিলিয়ে ব্যাংকের তালিকায় ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলো তখন ঝুঁকিতে পড়ে। তার মতে, দিন দিন গ্যাসের অবস্থার অবনতি হচ্ছে।
ধুঁকছে কারখানা : তিতাসের তথ্য বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে শিল্পের গ্রাহকদের যেখানে মাসে ৪ হাজার ৩৩০ এমএমসি গ্যাস সরবরাহ করা হতো, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৩৭ এমএমসি। শিল্পমালিকরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, গ্যাসসংকটের কারণে কালিয়াকৈর, চন্দ্রা, সাভার, আশুলিয়া, মির্জাপুর, ঘাটাইল এসব এলাকার পোশাক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বেশ কিছু কারখানায় গ্যাসের চাপ মাত্র ৫ থেকে ৬ পিএসআই। এ ছাড়া নবীনগর ও মানিকগঞ্জ এলাকায় দিনের বেলায় এখন মাত্র ১ থেকে ২ পিএসআই গ্যাসের চাপ পাওয়া যাচ্ছে। তারা জানান, ৮০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ নিয়ে কারখানা চালালেও ক্ষতি হয় না। কিন্তু যখন এর নিচে সরবরাহ নেমে যায় তখন থেকেই মালিকরা লাগাতার ক্ষতির মুখে পড়েন।
বাংলাদেশ সিরামিকস ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মইনুল ইসলাম বলেন, সাভার, মানিকগঞ্জ এবং গাজীপুরে থাকা টাইলস ও সিরাসিক কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ একেবারেই নেই। এসব কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ বলা যায় শূন্য। গ্যাস ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে কারখানাগুলো এখন ধুঁকছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গ্যাসের জন্য সরকারের ওপর চাপ দেওয়া যাচ্ছে না। আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ স্বীকার না করলেও অনেক ছোট ছোট টাইলস কারখানা এরই মধ্যে সাময়িকভাবে এবং কিছু একেবারেই উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে।
দিনের রান্না রাতে : গ্যাসসংকটে ভোগান্তি বেড়েছে আবাসিক গ্রাহকদেরও। দিনের বেলায় এখন গ্যাসের চাপ এতই কম থাকে যে তা দিয়ে রান্নার কাজ হয় না। রাতে চাপ কিছুটা বাড়লে গ্রাহকরা দিনের রান্না রাতেই সেরে রাখেন। মিরপুর ১২ নম্বর এলাকার গৃহিণী জিনিয়া কবির বলেন, আমি এখন রাতেই পরের দিনের রান্না করে রাখি। কারণ দিনে গ্যাস থাকে না।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আমিনুল ইসলামের বাসায় গত পাঁচ দিন ধরে গ্যাস নেই। শুরুতে তিনি ভেবেছিলেন তার প্রিপেইড কার্ডের ব্যালান্স শেষ। কিন্তু পরে জানতে পারেন আশপাশের অন্য বাড়িতেও গ্যাস নেই। নিরুপায় হয়ে তিনি একটি বৈদ্যুতিক চুলা কেনেন। এর সঙ্গে বিশেষায়িত হাঁড়িপাতিলও কিনতে হয়। আমিনুল বলেন, গ্যাসের মাসিক বিলের সঙ্গে বৈদ্যুতিক চুলার বাড়তি খরচ আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের ব্যয় একলাফে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, আদাবর, পল্লবী, শেওড়াপাড়া, শনিরআখড়া, মগবাজার, রামপুরা, বাড্ডা, মহাখালী, বাসাবো, সূত্রাপুর, রায়সাহেব বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় চরম গ্যাসসংকট দেখা দিয়েছে। বর্তমানে দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু সরবরাহ করা হচ্ছে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। গত কয়েক বছর ধরেই নিয়মিত গ্যাসের সরবরাহ কমে যাচ্ছে। যার ফলে বছরজুড়ে গ্রাহকদের গ্যাসসংকটে ভুগতে হচ্ছে।
স্টেশনে তিন গুণ বেশি সময় অপেক্ষা : সিএনজিচালক রহিম মিয়া গতকাল ঢাকার প্রগতি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের বাইরে গ্যাসের লাইনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তিনি জানান, গ্যাসের চাপ দিন দিন কমছে। এক বছর আগেও যেখানে ৩০ মিনিটে কাক্সিক্ষত গ্যাস নিতে পারতেন এখন এর চেয়ে কম পরিমাণ গ্যাস নেন তিন গুণ বেশি সময়ে। মিরপুর ১২ নম্বরে অবস্থিত সিরামিক ওয়ার্কস সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গত এক সপ্তাহ ধরে গ্যাসের জন্য গাড়ির দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। গ্যাসের চাপ কমে গেলে এই স্টেশনের প্রধান ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়। গ্যাসের চাপ কম থাকায় গাড়িচালকরা তাদের চাহিদার অর্ধেক গ্যাসও এখন নিতে পারছেন না। এ স্টেশনের গ্যাস সরবরাহকারীরা জানান, দিনে গ্যাসের চাপ থাকে না বললেই চলে। কখনো এটি ৯০-তে চলে যায়। এরপর গ্যাস দিলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। যে চালক আগে ৬০০ টাকার গ্যাস নিতেন তাকে এখন ২০০ টাকার গ্যাস দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নূর বলেন, ‘ঢাকার বাইরে গাজীপুরে গ্যাসের চাপ নেই বললেই চলে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে গ্যাস না থাকায় সিএনজি স্টেশন বন্ধ থাকছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় আমাদের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যন্ত্রপাতি চালাতে বিদ্যুতের খরচ দিতে হচ্ছে। এতে আমাদের ব্যবসা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। অনেক স্থানে গ্যাসের অভাবে সিএনজি স্টেশনগুলোর মালিকরা ব্যবসা বন্ধ করে দিচ্ছেন।’
রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলো সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, গ্যাসসংকটের কারণে গ্যাসের লাইন মাইল ছাড়িয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে একজন গাড়িচালক কাক্সিক্ষত গ্যাস পাচ্ছেন না। আগে দিনে একবার যে পরিমাণ গ্যাসে চলে যেত এখন গ্যাস কম পাওয়ায় দুই থেকে তিনবার পর্যন্ত একজন চালককে গ্যাস নিতে হচ্ছে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গ্যাসের চাপ থাকে না বললেই চলে। রাতের দিকে চাপ সামান্য বৃদ্ধি পায়।
রাজধানীর প্রগতি সিএনজি ফিলিং স্টেশনে ব্যক্তিগত গাড়িচালক মো. মহসীন বলেন, ‘গত দেড় থেকে দুই মাস ধরে গ্যাসের এই সংকট দেখছি। আগে ৫০০ টাকার গ্যাস নিলে পুরো দিন আর গ্যাস নিতে হতো না। কিন্তু গ্যাসের চাপ এখন কম থাকায় মাত্র ১২০ থেকে ১৫০ টাকার গ্যাস নিতে পারছি। এজন্য প্রতিদিনই দুই থেকে তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে দুই থেকে তিনবার গ্যাস নিতে হচ্ছে। এতে সময় ও শক্তি দুই অপচয় হচ্ছে।’
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন