৬০ বিধায়ক, ৭০ কাউন্সিলরের উপস্থিতিতে নতুন নেতৃত্ব
বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, তাদের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দলের ৬০ জন বিধায়ক এবং কলকাতা পুরসভার অন্তত ৭০ জন কাউন্সিলর। সেই বৈঠকেই সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন মধ্য হাওড়ার জয়ী বিধায়ক অরূপ রায়। একইসঙ্গে দলের নতুন সাংগঠনিক কাঠামোও ঘোষণা করা হয়। ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়েছেন অরূপ বিশ্বাস, ফিরহাদ হাকিম এবং রথীন ঘোষ। সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন জাভেদ খান, সন্দীপন সাহা, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সাবিনা ইয়াসমিন। দলের কোষাধ্যক্ষ করা হয়েছে আখতারুজ্জামানকে।
সাংসদদের বড় অংশ ইতিমধ্যেই দলত্যাগ
প্রতীক ও সম্পত্তির দাবিতে কমিশনের দ্বারস্থ বিদ্রোহীরা
সোমবার নিউটাউনের একটি হোটেলে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আমরাই আসল তৃণমূল। দলের প্রতীক ও সম্পত্তির অধিকার পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত নথি নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দেওয়া হচ্ছে।” তিনি আরও জানান, “আগামীকালই জানা যাবে বিদ্রোহী সাংসদরা কী সিদ্ধান্ত নেবেন।”
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রতীক ‘জোড়াফুল’ এবং দলের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত কার হাতে যায়।
বৈঠকের মঞ্চে নেই মমতার ছবি
সোমবার দুপুরে নিউটাউনের নোভোটেল হোটেলে বিদ্রোহী শিবিরের ডাকা বৈঠকে একটি বিষয় বিশেষভাবে নজর কাড়ে। মঞ্চে তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যানার থাকলেও সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও ছবি দেখা যায়নি। পরিবর্তে ব্যানারে স্থান পেয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধী এবং বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকরের ছবি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি ছিল দলের নতুন রাজনৈতিক অবস্থানের একটি প্রতীকী বার্তা।
ধ্বনি ভোটে পাশ অরূপ রায়ের নাম
বৈঠকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরিয়ে অরূপ রায়কে চেয়ারম্যান করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে ধ্বনি ভোটে সেই প্রস্তাব গৃহীত হয়।
তবে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ঋতব্রত বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের কোনও ব্যক্তিগত ক্ষোভ নেই। তিনি চাইলে দলের পরামর্শদাতা হিসেবে থাকতে পারেন।” যদিও একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য নতুন তৃণমূলে কোনও ভূমিকা রাখা হয়নি।
কীভাবে শুরু হয়েছিল তৃণমূলে ভাঙন?
রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম বিধানসভায় পাঠানো হয়েছিল। সেই প্রস্তাবে ৭০ জন বিধায়কের স্বাক্ষর রয়েছে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহা এবং উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, তারা ওই প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেননি এবং তাদের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। পরে তারা স্পিকারের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এরপর ধীরে ধীরে তৃণমূলের একাধিক নির্বাচিত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে যোগ দিতে শুরু করেন। পরবর্তীতে বিধানসভার স্পিকার ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেন। সেই সময় থেকেই তৃণমূলের অন্দরের বিভাজন প্রকাশ্যে আসে।
অভিষেককে ঘিরেই বাড়ছিল অসন্তোষ
দলের নির্বাচনী বিপর্যয়ের জন্য যখন অনেক নেতা-কর্মী অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেই দায়ী করতে শুরু করেন, ঠিক সেই সময়ই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নতুন সাংগঠনিক কমিটি গঠন করেন এবং অভিষেককে পুনরায় সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের পদে বহাল রাখেন। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, এরপর থেকেই একে একে বহু সাংসদ এবং নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস ত্যাগ করতে শুরু করেন।
রাজনৈতিক মহলের নজর এখন কোথায়?
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিষ্ঠিত তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এখন কার্যত তাদের হাতেই। যদিও এই দাবির সাংবিধানিক ও আইনি বৈধতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। তবে রাজনৈতিক মহলের নজর এখন নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। কারণ জোড়াফুল প্রতীক, দলের নাম এবং সম্পত্তির অধিকার নিয়ে যে লড়াই শুরু হয়েছে, তার ফলাফলই নির্ধারণ করবে তৃণমূল কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশ। তবে নিয়ম বলছে যেদিকে বিধায়খ সাংসদের সংখ্যা বেশি থাকবে সেই পক্ষ গুরুত্ব পাবে।