• শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫৪ পূর্বাহ্ন
Headline
কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি, ট্রাফিক উত্তর বিভাগের কল্যাণ সভায় পুরস্কৃত হলেন সেরা পুলিশ সদস্যরা ঠাকুরগাঁও-১ উপ-নির্বাচন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীনের ভূমিধস জয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠক  ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের দাম অপরিবর্তিত থাকছে নোয়াখালীতে অস্ত্র তৈরির কারিগর গ্রেপ্তার, বন্দুক ও সরঞ্জাম উদ্ধার যুবদল আপনাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, ভাই: বিএনপি নেতাদের সহযোগিতার আহ্বান মুন্নার টয়োটার প্রথম প্রাইভেট কারে উঠলেন প্রধানমন্ত্রী মদিনার যে স্থানে নবী কারিম (সা.) তিনটি দোয়া করেছিলেন সৌদি আরবে প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর বর্বর নির্যাতন, মৃত্যুদন্ড ও শিরশ্ছেদ বন্ধ করুন শ্রমিক বিক্ষোভ সমাবেশে সাইফুল হক উৎসবমুখর পরিবেশে ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ সম্পন্ন 

বালুর নেশায় চলে গুলি, পদ্মার চরে ৯ মাসে সাত খুন

নাটোর প্রতিনিধি / ২৭ Time View
Update : রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

পদ্মার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল যেন এখন এক অঘোষিত যুদ্ধক্ষেত্র। অবৈধ বালু উত্তোলন ও কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে সেখানে গড়ে উঠেছে একাধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী। আধিপত্য বিস্তার, বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির দ্বন্দ্বে প্রায়ই চলছে গোলাগুলি। আর সেই সংঘাতের বলি হচ্ছেন সাধারণ মানুষসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষের সদস্যরা। গত নয় মাসে পদ্মার চর এলাকায় অন্তত সাতজন গুলিতে নিহত হয়েছেন।
নাটোরের লালপুর, রাজশাহীর বাঘা, পাবনার ঈশ্বরদী ও কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার পদ্মা চরজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে একাধিক সশস্ত্র বাহিনী। স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রির নিয়ন্ত্রণ নিতে এসব বাহিনীর মধ্যে প্রায়ই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। প্রশাসনের অভিযান ও গ্রেপ্তার সত্ত্বেও থামছে না খুনোখুনি।
সবশেষ গত মঙ্গলবার (১৬ জুন) লালপুর উপজেলার রাইটার চর এলাকায় পদ্মা নদীতে ভাসমান একটি নৌকা থেকে সাহাবুল ইসলাম (৪৫) নামে এক ব্যক্তির গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত সাহাবুল পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার সাঁড়া গোপালপুর গ্রামের ইউনুস প্রামাণিকের ছেলে।
লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন,
“ভোরের দিকে দুর্বৃত্তরা নদীর তীরে অবস্থান নিয়ে গুলি চালায়। এতে সাহাবুল ইসলাম নিহত হন এবং একজন জেলে আহত হন। আহত ব্যক্তিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে এবং জড়িতদের শনাক্তে কাজ করছে পুলিশ।”
৯ মাসে সাত খুন
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশি তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত পদ্মার চর এলাকায় অন্তত সাতটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই চারজন নিহত হয়েছেন।
গত বছরের ২৭ অক্টোবর কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তবর্তী চৌদ্দহাজার চরে সংঘর্ষে নিহত হন আমান মণ্ডল ও নাজমুল হোসেন। পরদিন উদ্ধার করা হয় কাঁকন বাহিনীর সদস্য হিসেবে পরিচিত লিটন হোসেনের মরদেহ।
এরপর চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নের পলাশি ফতেপুর এলাকায় নিজ বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয় সোহেল রানাকে।
১৮ মে কালিদাসখালী চরে সশস্ত্র হামলায় নিহত হন স্বপন বেপারী (৪০)। হামলাকারীরা হত্যার পর তার মরদেহও নিয়ে যায়।
গত ৯ জুন চর জাজিরা এলাকায় একটি স্পিডবোট থেকে উদ্ধার করা হয় বাগাতিপাড়া উপজেলার হিজলি পাবনাপাড়া গ্রামের আজিজুল হাকিমের গুলিবিদ্ধ মরদেহ।
সবশেষ ১৬ জুন নিহত হন সাহাবুল ইসলাম।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে কাঁকন বাহিনীসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে সংঘাত চলছে। এতে চরাঞ্চলে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
১১ সন্ত্রাসী বাহিনীর দৌরাত্ম্য
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা চরাঞ্চলে অন্তত ১১টি সন্ত্রাসী বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে কাঁকন বাহিনী, মণ্ডল বাহিনী, টুকু বাহিনী, সাঈদ বাহিনী, লালচাঁদ বাহিনী, রাখি বাহিনী, শরীফ কাইগি বাহিনী, রাজ্জাক বাহিনী, চল্লিশ বাহিনী, বাহান্ন বাহিনী এবং সুখচাঁদ-নাহারুল বাহিনী উল্লেখযোগ্য।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব বাহিনী চরাঞ্চলের মানুষকে জিম্মি করে চাঁদাবাজি, জমি দখল, বালু লুট ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে কাঁকন বাহিনীর বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতার অভিযোগ।
পুলিশের অভিযানেও থামছে না সন্ত্রাস
পদ্মার চরাঞ্চলে সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান পরিচালনা করেছে। গত মে মাসে বিশেষ অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ, দেশীয় অস্ত্র, মাদক, মোটরসাইকেল, স্পিডবোট ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
এছাড়া বালু উত্তোলন ও চাঁদাবাজির অভিযোগে সেনাবাহিনী, র‌্যাব ও পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে কাঁকন বাহিনীর আস্তানা থেকে পিস্তল, গুলি, নগদ অর্থ, মাদকদ্রব্য এবং মানব খুলিসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করে।
বাঘা থানার ওসি সেরাজুল হক বলেন,
“অপারেশন ফাস্ট লাইটের আওতায় কয়েক দফায় ২০৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
‘পান্না বাহিনী’ থেকে ‘কাঁকন বাহিনী’
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই দশক আগে পদ্মা চরে ‘পান্না বাহিনী’ ও ‘কাঁকন বাহিনী’ নামে দুটি শক্তিশালী সশস্ত্র গ্রুপের উত্থান ঘটে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে সংঘর্ষে বহু মানুষ নিহত হন।
২০০৫ সালে পান্না নিহত হওয়ার পর কাঁকন বাহিনীর প্রভাব বাড়তে থাকে। পরবর্তীতে কাঁকন ওরফে হাসানুজ্জামান কাঁকন বিদেশ থেকে দেশে ফিরে বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় ভুক্তভোগীরা দাবি করেন, বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, জমি দখল ও ডাকাতির সঙ্গে কাঁকন বাহিনীর সদস্যরা জড়িত। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কাঁকন।
কাঁকন বলেন,
“আমার বিরুদ্ধে আনা চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক। হত্যা বা গুলিবর্ষণের ঘটনায় আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। প্রশাসনের বিভিন্ন তদন্তেও এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।”
পুলিশের বক্তব্য
নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক বলেন,
“পদ্মা চরাঞ্চলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, অবৈধ বালু উত্তোলন ও অস্ত্রধারী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জেলা পুলিশের সব ইউনিট সমন্বিতভাবে কাজ করছে।”
পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি খন্দকার মো. শামীম হোসেন বলেন,
“পদ্মা চরাঞ্চলে খুনোখুনির ঘটনা নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে পুলিশ এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। চরাঞ্চলগুলো বিস্তীর্ণ ও দুর্গম হওয়ায় অপরাধীরা গুলি চালিয়ে দ্রুত আত্মগোপন করে। তাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। রাজশাহী ও খুলনা রেঞ্জের পুলিশ সমন্বিতভাবে কাজ করছে, যাতে সন্ত্রাসীদের মূল শিকড় উপড়ে ফেলা যায়।”
আতঙ্কে চরবাসী
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বালুমহালকে কেন্দ্র করে চলমান সন্ত্রাস ও খুনোখুনির কারণে তারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় মানুষের চলাচল কমে যায়। কৃষকরা নিজেদের জমিতে কাজ করতেও ভয় পান।
তাদের দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, সন্ত্রাসী বাহিনীর অস্ত্র উদ্ধার এবং চরাঞ্চলে স্থায়ী আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা গেলে পদ্মার চর আরও রক্তাক্ত হয়ে উঠবে। বর্তমানে চরবাসীর একটাই প্রত্যাশা—সন্ত্রাসমুক্ত, শান্তিপূর্ণ পদ্মা চর।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category