এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত হালদা নদী। সেই নদীর একপাশে লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে চলছে পাড় রক্ষায় জিও ব্যাগ ফেলার কাজ, আর অন্যপাশে রাতের আঁধারে নদীর পাড় কেটে মাটি বিক্রির অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। এমন চিত্র দেখা গেছে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের পাঁচপুকুরিয়া এলাকায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর ভাঙন ঠেকাতে সুয়াবিল ইউনিয়ন অংশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলমান থাকলেও বিপরীত পাশে অবাধে কাটা হচ্ছে নদীর পাড় ও প্রতিরক্ষা বাঁধ। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় সরওয়ার কামাল, মো. আকবর ও কুদ্দুসসহ কয়েকজনের একটি প্রভাবশালী চক্র রাত ১২টার পর থেকে ভোর পর্যন্ত স্কেভেটর (ভেকু) ও পিকআপ ভ্যান ব্যবহার করে নদীর পাড় কেটে মাটি তুলে নিয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, হালদা নদীর ওপর পাঁচপুকুরিয়া-সিদ্ধাশ্রম নির্মাণাধীন সেতুর উত্তর পাশে সুয়াবিল অংশে শত শত জিও ব্যাগ ফেলে পাড় রক্ষার কাজ করছে সরকার। ঠিক বিপরীত পাশে সুন্দরপুর অংশে ৫ থেকে ১০ ফুট গভীর গর্ত করে নদীর পাড় কেটে সাবাড় করা হয়েছে। এছাড়া আশপাশের আরও কয়েকটি পয়েন্ট থেকেও একইভাবে মাটি কাটা হয়েছে। এসব মাটি টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন ভিটা, পুকুর ও জমি ভরাটে ব্যবহার করা হচ্ছে।

স্থানীয়দের দেয়া তথ্যে গিয়ে ওই এলাকার প্রবাসী ইব্রাহিমের ভিটায়ও দেখা যায় হালদার পাড় কেটে আনা বালু মিশ্রিত মাটি। তবে বিষয়টি নিয়ে প্রথমে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন ইব্রাহিম। পরে তিনি বলেন, এগুলো আমার জায়গা না, আমার ভাইয়ের ভিটা ভরাটের জন্য মাটি আনা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যারা এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করেন, তাদের ভয়ভীতি দেখানো হয়। নিরাপত্তার কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না।
তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের নাকের ডগায় এ অবৈধ কর্মকাণ্ড চললেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এতে প্রভাবশালী চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে সরওয়ার কামাল, মো. আকবর ও কুদ্দুসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা সবাই মাটি কাটার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তারা বলেন, এসব কারা করছে জানি না।
পরিবেশবিদরা বলছে, দীর্ঘদিন ধরে চাপের মধ্যে থাকা হালদা নদীতে এভাবে পাড় কাটা অব্যাহত থাকলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। পাশাপাশি মা মাছের ডিম ছাড়ার পরিবেশও ধ্বংস হবে। এতে নদীর জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় মৎস্যসম্পদ ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়বে।

চট্টগ্রামে পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সাংবাদিক সিফাতুল্লাহ সিফাত বর্তমান বাংলাদেশকে বলেন, পাড় কেটে নেওয়া মানে নদীর স্বাভাবিক গঠন পরিবর্তন করে ফেলা। এতে শুধু জলজ প্রাণী নয়, পুরো পরিবেশেরই ক্ষতি হবে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে। ভবিষ্যতে বন্যাসহ নানা দুর্যোগে মানুষ ক্ষতির মুখে পড়তে পারে, যার ভোগান্তি দীর্ঘদিন থাকবে। দেশে যেহেতু এ বিষয়ে আইন রয়েছে, তাই প্রশাসনকে যেভাবেই হোক জড়িতদের চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট আইনের আওতায় আনতে হবে। এসব ঘটনায় মামলা করতে হবে, তাহলেই আসামিরা শনাক্ত হবে।
চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সোহাগ তালুকদার বর্তমান বাংলাদেশকে বলেন, যত্রতত্র পাড় কাটলে নদীভাঙন, গতিপথ পরিবর্তনসহ নানা ঝুঁকি তৈরি হয়। সরকার যেখানে নদীভাঙন রোধে কোটি কোটি টাকার কাজ করছে, সেখানে নদীর পাড় কাটলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
হালদা নদী গবেষক ও বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল কিবরিয়া বর্তমান বাংলাদেশকে বলেন, পাড় কাটা নদী ও নদীর পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এটি আইনগতভাবেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। হালদা নদীতে ২০১৭ সালে সব বালুমহলের ইজারা নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এটিকে হেরিটেজ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তাই কোনোভাবেই নদী থেকে বালু উত্তোলন ও পাড় কাটা যাবে না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কাজ হচ্ছে এসব দমন করা এবং দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনা। পাশাপাশি প্রশাসনের সঙ্গে স্থানীয়দেরও সাহসী প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে।
ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহিম বর্তমান বাংলাদেশকে বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমি আগে অবগত ছিলাম না। এখন জানতে পেরেছি। অভিযান চালানোর চেষ্টা করব।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত অভিযান না চালালে বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ ভাঙন ও বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়বে। তারা অবিলম্বে ভেকু ও পিকআপ ভ্যান জব্দ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।