• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৮ অপরাহ্ন
Headline
নলডাঙ্গায় বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস পালিত, গুরুত্ব পেল জনসচেতনতা যুবদলের ৪৮ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী মাহমুদুল আলমের উদ্যোগে প্রতিবন্ধীদের মাঝে হুইল চেয়ার, সেলাই মেশিন ও ক্রাচ বিতরণ সান্তাহার পৌর যুবদলের উদ্যোগে নানা আয়োজনে ৪৮ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালিত দুই বছরের মধ্যে স্বাস্থ্যখাতে আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্য: স্বাস্থ্যমন্ত্রী বাংলাদেশের ৫ অগ্রাধিকার খাতে জাপানি বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে: রাষ্ট্রপতি  বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে সুইজারল্যান্ডের প্রতি রাষ্ট্রপতির আহ্বান বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণে জাপানের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী  বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে আগ্রহী জাপান উন্নত বাংলাদেশ গড়তে প্রবাসী-দেশবাসীকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

কোরআনের বার্তা: সূরা আল-আন‘আম

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৮৯ Time View
Update : সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র আল-কোরআনের ষষ্ঠ সূরা হলো ‘সূরা আল-আন‘আম’। কোরআনের ক্রমানুসারে এর অবস্থান ষষ্ঠ হলেও নাজিলের দিক থেকে এটি ৮৯তম। পবিত্র কোরআনের প্রথম পাঁচটি সূরায় (সূরা আল-ফাতিহা ছাড়া বাকি চারটি—বাকারা, আল-ইমরান, নিসা ও মায়িদা) মূলত শরীয়তের বিধান, হালাল-হারাম, আইনি কাঠামো এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নিয়ম-কানুন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তবে সূরা আল-আন‘আমের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই সূরাটি প্রায় অবিকলভাবে এবং সামগ্রিকভাবে ইসলামের মূল স্তম্ভ—‘আকিদাহ’ বা বিশ্বাসের বুনিয়াদ (তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাত) নিয়ে সাজানো।

সাধারণ পরিচিতি ও পরিসংখ্যান আলোচনাকালে সূরাটির নানা বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। এর নামকরণ ‘আল-আন‘আম’ থেকে, যার অর্থ ‘গৃহপালিত পশু’ (যেমন: উট, গরু, ছাগল, ভেড়া ইত্যাদি)। তৎকালীন আরবের মুশরিকরা এসব গৃহপালিত পশু নিয়ে নানা রকম মনগড়া ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন নিয়ম তৈরি করেছিল। এই সূরার ১৩৬ থেকে ১৪৪ নম্বর আয়াত পর্যন্ত তাদের এই কুসংস্কারগুলোর অকাট্য ও যৌক্তিক খণ্ডন করা হয়েছে বলে এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে ‘সূরা আল-আন‘আম’।

সূরা আল-আন‘আম একটি পূর্ণাঙ্গ মাক্কী সূরা। এর মোট আয়াত সংখ্যা ১৬৫টি এবং রুকু সংখ্যা ২০টি।

নাজিলের অলৌকিক বিশেষত্ব: এই সূরাটি নাজিল হওয়ার ধরন ছিল অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং অনন্য। সাধারণ নিয়মে কোরআনের সূরাগুলো বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে ভেঙে ভেঙে নাজিল হতো। কিন্তু বিভিন্ন বিশুদ্ধ হাদিস (যেমন: তাবারানী ও বায়হাকী) অনুযায়ী, সূরা আল-আন‘আমের সিংহভাগ অংশ একযোগে, এক রাতে সম্পূর্ণ নাজিল হয়েছিল। এটি নাজিল হওয়ার সময় আল্লাহর মহিমা ও তাসবীহ পাঠ করতে করতে ৭০,০০০ (সত্তর হাজার) ফেরেশতা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে দুনিয়াতে এসেছিলেন, যা এই সূরার বিশালত্ব ও গুরুত্বের প্রমাণ বহন করে।

অবতরণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট (শানে নুযূল): সূরাটি মাক্কী জীবনের একেবারে শেষভাগে—অর্থাৎ হিজরতের ঠিক এক বা দেড় বছর আগে নাজিল হয়। তৎকালীন সময়ে মক্কার কুরাইশ কাফেরদের বিরোধিতা ও নবীজির ওপর নির্যাতন চরম আকার ধারণ করেছিল। ইসলামের ছায়া হয়ে থাকা নবীজির প্রিয় চাচা হযরত আবু তালিব এবং প্রিয়তমা স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা.) ইন্তেকাল করেছেন (যাকে ইতিহাসের ‘আমুল হুযন’ বা দুঃখের বছর বলা হয়)। ঠিক এই মানসিক ও বাহ্যিক কঠিন সংকটের সময়ে আল্লাহ তাআলা এই সূরাটি নাজিল করে রাসূল (সা.) ও মুসলমানদের মনকে শক্ত করেন।

কুরাইশরা তখন ঈমান আনার পরিবর্তে নবীজির কাছে অবাস্তব ও অলৌকিক সব দাবি করত। তারা বলত—

  • ‘কেন তাঁর কাছে সরাসরি কোনো ফেরেশতা দৃশ্যমান হয়ে আসে না?’
  • ‘কেন মক্কার পাহাড়গুলো সোনা হয়ে যাচ্ছে না?’
  • ‘কেন তিনি মৃত মানুষকে জীবিত করে দেখাচ্ছেন না?’
  • ‘কেন তাঁর ওপর আকাশ থেকে সরাসরি কোনো লিখিত কিতাব অবতীর্ণ হয় না?’

তাদের এই সব হঠকারী ও অহংকারপূর্ণ দাবির একযোগে যৌক্তিক জবাব দিতে এবং তাওহীদের অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে এই সূরাটি অবতীর্ণ হয়।

মূল ভাববস্তু ও আয়াতের গভীর বিশ্লেষণ: সূরা আল-আন‘আমের মূল সুর হলো শিরক খণ্ডন এবং তাওহীদ প্রতিষ্ঠা। সূরার প্রধান প্রধান বিষয়গুলোকে নিচে কয়েকটি ভাগে আলোচনা করা হলো:

ক. নিখিল বিশ্বে আল্লাহর একত্ববাদের প্রমাণ: সূরার শুরুই হয়েছে আল্লাহর প্রশংসা এবং আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টির ঘোষণা দিয়ে। আল্লাহ তাআলা বিশ্বজগতের চমৎকার নিয়ম, দিন-রাত্রির আবর্তন, মেঘ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ, মৃত ভূমি থেকে শস্য ও উদ্ভিদের চারা গজানো এবং অন্ধকারের বুক চিরে আলোর স্ফূরণের মতো প্রাকৃতিক নিদর্শনগুলোর অবতারণা করেছেন। এগুলোর মাধ্যমে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, যার ক্ষমতা এত নিখুঁত, তিনি ছাড়া অন্য কেউ ইবাদতের যোগ্য হতে পারে না।

খ. হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর বুদ্ধিবৃত্তিক ও যৌক্তিক বিতর্ক: এই সূরার একটি অনবদ্য ও বৈপ্লবিক অংশ হলো হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সত্য অনুসন্ধানের কাহিনী (আয়াত: ৭৪-৭৯)। তিনি তাঁর জাতিকে মূর্তিপূজা ও নক্ষত্রপূজা থেকে ফেরাতে এক অভিনব বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি উপস্থাপন করেন। তিনি প্রথমে রাতের আকাশে জ্বলজ্বলে ‘তারা’ দেখে বললেন, ‘এটি আমার রব?’ কিন্তু যখন তা ডুবে গেল, তিনি বললেন, ‘যা হারিয়ে যায় তা উপাস্য হতে পারে না।’ এরপর পর্যায়ক্রমে চাঁদ এবং সূর্যকে দেখেও তিনি একই যুক্তি দিলেন যে, এরা সবাই নিয়মের অধীন এবং অস্তমিত হয়। সৃষ্টির এই পরিবর্তনশীলতা প্রমাণ করে যে এরা কেউ ইবাদতের যোগ্য নয়। পরিশেষে তিনি ঘোষণা করলেন:

‘নিশ্চয়ই আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁর দিকে মুখ ফিরাচ্ছি, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।’

গ. দশটি চিরন্তন নৈতিক উপদেশ: এই সূরার ১৫১ থেকে ১৫৩ নম্বর আয়াতে ১০টি মৌলিক মানবীয় ও নৈতিক বিধান দেওয়া হয়েছে, যা মানবজাতির জন্য একটি সম্পূর্ণ জীবনবিধান এবং সব আসমানী কিতাবের সারকথা: ১. আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক (অংশীদার) না করা। ২. পিতা-মাতার সাথে সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার করা। ৩. অভাব বা দারিদ্র্যের ভয়ে নিজের সন্তানদের হত্যা না করা (আল্লাহই সবার রিযিকদাতা)। ৪. প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে—যাবতীয় অশ্লীল ও ব্যভিচারমূলক কাজের কাছেও না যাওয়া। ৫. আল্লাহ যাকে হত্যা করা নিষিদ্ধ করেছেন, শরীয়তের ন্যায়সঙ্গত কারণ (যেমন: বিচারিক রায়) ছাড়া তাকে হত্যা না করা। ৬. এতিমের বয়োপ্রাপ্তি বা পরিণত বয়স না হওয়া পর্যন্ত তার সম্পদের কাছে না যাওয়া (উত্তম রক্ষণাবেক্ষণের উদ্দেশ্য ছাড়া)। ৭. ব্যবসা-বাণিজ্যে পরিমাপ ও ওজন সঠিকভাবে পূর্ণ করা। ৮. যখনই কোনো কথা বা বিচার করা হবে, তাতে ন্যায়বিচার কায়েম রাখা—তা যদি নিজের নিকটাত্মীয়ের বিরুদ্ধেও যায়। ৯. আল্লাহর নামে কৃত অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করা। ১০. আল্লাহর সরল-সঠিক পথ (সিরাতুল মুস্তাকিম)-এর অনুসরণ করা এবং অন্যান্য ভ্রান্ত উপদলের পথ পরিহার করা।

ঘ. একজন মুমিনের জীবনের মূল দর্শন: সূরার শেষ দিকে ১৬২ নম্বর আয়াতে একজন প্রকৃত মুসলমানের জীবনের আসল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে এক লাইনে বেঁধে দেওয়া হয়েছে: “বলো, নিশ্চয়ই আমার সালাত (নামাজ), আমার কুরবানি (বা ইবাদত), আমার জীবন ও আমার মরণ—সবই বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।” এটিই একজন মুমিনের জীবনের চূড়ান্ত ইশতেহার। মুমিনের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস, কর্ম, আনন্দ এবং ত্যাগ যেন একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই আবর্তিত হয়।

সূরার বিশেষ ফজিলত ও গুরুত্ব

ঈমান ও আকিদাহ মজবুতকরণ: এই সূরা নিয়মিত পাঠ ও অনুধাবন করলে অন্তরে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও মহিমা গেঁথে যায়। মনের ভেতরের যাবতীয় সংশয়, কুফরি ও শিরকের অন্ধকার দূর হয়।

ফেরেশতাদের দোয়ার বরকত: যেহেতু এই সূরাটি সত্তর হাজার ফেরেশতার তাসবীহ ও পাহারার মাধ্যমে নাজিল হয়েছিল, তাই এই সূরার নির্দেশনাবলী যে ব্যক্তি নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করবে, সে আল্লাহর বিশেষ রহমত ও ফেরেশতাদের ইস্তিগফারের (ক্ষমা প্রার্থনা) অন্তর্ভুক্ত হবে।

মনস্তাত্ত্বিক সান্ত্বনা ও শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্তি: আকিদাহ বিষয়ক এই আয়াতগুলো মানুষের মনকে দুনিয়ার হতাশা থেকে মুক্ত রাখে। মানুষের মনে এই বিশ্বাস দৃঢ় হয় যে, লাভ-ক্ষতি, জীবন-মৃত্যুর মালিক একমাত্র আল্লাহ, অন্যকোনো দৃশ্যমান বা কাল্পনিক শক্তি নয়।

সূরা আল-আন‘আম-এর বাস্তবমুখী শিক্ষা: অন্ধ অনুকরণ ও সংখ্যাগুরুত্বের মোহ ত্যাগ করা: সমাজে সবাই একটা ভুল কাজ করছে বলেই তা সঠিক হয়ে যায় না। আল্লাহ তাআলা এই সূরার ১১৬ নম্বর আয়াতে স্পষ্টভাবে বলেছেন—’যদি তুমি পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের অনুকরণ করো, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে।’ সত্য সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না; সত্য পরিমাপ করতে হয় দলিল, যুক্তি ও ওহীর জ্ঞান দিয়ে।

কুসংস্কারের অবসান: পশুপাখি, দিন-ক্ষণ বা কোনো বস্তুকে কেন্দ্র করে কুলক্ষণ বা সুলক্ষণ নির্ধারণ করা যাবে না। আরবের লোকেরা যেমন পশুর কান চিরে বা নির্দিষ্ট পশুকে নির্দিষ্ট দেবীর নামে ছেড়ে দিয়ে হালাল-হারামের মনগড়া নিয়ম করত (বাহীরা, সায়েবা ইত্যাদি), বর্তমান সমাজেও এমন বহু কুসংস্কার রয়েছে যা বর্জন করা জরুরি।

আল্লাহর দয়া ও ক্ষমার ওপর ভরসা: মানুষ যতই গুনাহ করুক না কেন, আল্লাহ তওবাকারীদের প্রতি পরম দয়ালু। কষ্টের পর যে অবশ্যই স্বস্তি আসবে, সেই আশার বাণী এই সূরায় বারবার প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

সংক্ষিপ্তসার: সূরা আল-আন‘আম মূলত ইসলামি আকিদাহর একটি মহাসনদ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই মহাবিশ্ব কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এর একজন পরম পরিচালক আছেন, যিনি মেঘ থেকে বৃষ্টি ঝরান, শস্যদানা অঙ্কুরিত করেন এবং রাতকে চিরে দিনের আলো আনেন। তাই আমাদের সমস্ত ইবাদত, ভয়, আশা এবং ভালোবাসা কেবল তাঁর জন্যই নিবেদিত হওয়া উচিত। শিরকের সমস্ত সূক্ষ্ম ও প্রকাশ্য রূপ থেকে বেঁচে থেকে, তাওহীদের ওপর ভিত্তি করে জীবন গড়া এবং এই সূরায় বর্ণিত ১০টি চিরন্তন উপদেশ ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত বা কায়েম করাই সরল পথ (সিরাতুল মুস্তাকিম)। এই পথেই নিহিত রয়েছে ইহকাল ও পরকালের প্রকৃত মুক্তি।

পরবর্তী পর্ব: সূরা আল-আ’রাফ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category