রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য এনবিআর আসন্ন বাজেটে নিত্যপণ্য; বিশেষ করে ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, ছোলা, মসুর ডাল, আদা, হলুদ, শুকনা মরিচ, ভুট্টা, আটা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল ও মসলা কেনার জন্য স্থানীয় ঋণপত্রের কমিশনের ওপর উৎসে কর দশমিক ৫০ থেকে বাড়িয়ে এক শতাংশ করার প্রস্তাব করেছে। তবে এ করহার অপরিবর্তিত থাকতে পারে বলেও আভাস পাওয়া গেছে। একইভাবে বাদাম, খেজুর, কম্পিউটার ও কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ এবং সব ধরনের ফল কেনার ক্ষেত্রেও একই হার অর্থাৎ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে এক শতাংশ নির্ধারণ করতে চায় এনবিআর।
আগামী বাজেটে ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা বাড়ছে। সূত্র জানায়, এ ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখ ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে চার লাখ টাকা করার অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। অন্তর্বর্তী সরকার আগামী অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্ত দিয়েছিল।
তবে প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, মোটরসাইকেলের এই করহার অনেক বেশি। তাই তিনি ১১১-১২৫ সিসিতে এক হাজার, ১২৬-১৬৫ সিসি পর্যন্ত তিন হাজার টাকা এবং ১৬৫ সিসির বেশি হলে প্রতি বছর পাঁচ হাজার টাকা কর নির্ধারণের নির্দেশনা দিয়েছেন।
দেশের আনাচে-কানাচে থাকা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাও করের আওতায় আনতে চায় সরকার। জানা গেছে, সিটি করপোরেশন এলাকার মধ্যে হলে পাঁচ হাজার, পৌরসভা হলে দুই হাজার ও ইউনিয়নের ক্ষেত্রে প্রতি বছর এক হাজার টাকা কর দিতে হবে–এমন সিদ্ধান্ত জানিয়েছে এনবিআর। এ ক্ষেত্রে সরাসরি কোনো করহার নির্ধারণ করে না দিলেও এই হার কমিয়ে আনতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মোবাইল ফোন, এসি, ফ্রিজ, এলইডি/এনার্জি সেভিং লাইট, সিসি ক্যামেরা, ব্যাংকের বুথের জন্য এটিএম মেশিন–এসব এখন বিলাসবহুল পণ্য নয়। রাজস্ব আদায় বাড়াতে এসব পণ্যের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-কর আগের তুলনায় বাড়বে। এসব পণ্য উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে রেয়াতি সুবিধা তুলে দিতে চায় সরকার। এর ফলে ঘরে ব্যবহারের উপকরণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ক্রেতাকে বাড়তি খরচ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী রাজস্ব বোর্ডের এই প্রস্তাবটির আরও পর্যালোচনা করার নির্দেশনা দেন।
বৈধ পথে স্বর্ণ আমদানি নিশ্চিত করতে ও সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে প্রতি ভরিতে পাঁচ হাজার টাকা ভ্যাট আরোপের সুপারিশ করেছে এনবিআর। তবে যেকোনো ধরনের অনুষ্ঠানে স্বর্ণ ব্যবহারের রেওয়াজ থাকায় প্রধানমন্ত্রী ভ্যাটের হার আরও কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছেন। বর্তমানে স্বর্ণ কেনার ক্ষেত্রে পাঁচ শতাংশ ভ্যাট নির্ধারিত রয়েছে।
আগামী বাজেটে সিগারেটের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে রাজস্ব বোর্ড। এতে সায় দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ফলে সিগারেটের দাম বাড়তে পারে। এছাড়া হার্টের রিং, ডায়ালাইসিসের টিউবের পাশাপাশি ঝুট ব্যবসায়ীদের ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাবেও সায় দেন তিনি। তবে কোনো পরিবর্তন আসছে না করপোরেট করহারে।
ধনীদের আগের চেয়ে বেশি কর দিতে হবে। বর্তমানে একজন করদাতার নিট পরিসম্পদের মূল্যমান চার কোটি টাকা পর্যন্ত সারচার্জ শূন্য। চার কোটি টাকার বেশি হলে ১০ শতাংশ এবং ৫০ কোটি টাকা অতিক্রম করলে সারচার্জের পরিমাণ ৩৫ শতাংশ। এ ছাড়া একাধিক গাড়ি থাকলে সিসিভেদে ২৫ হাজার থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা পরিবেশ সারচার্জ দিতে হয়। আগামী বাজেটে বাজারমূল্যের ওপর ভিত্তি করে চার কোটি টাকার বেশি তবে ১০ কোটির কম সম্পদ থাকলে তাঁকে সম্পদমূল্যের শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ ‘সম্পদ কর’ দিতে হবে। ১০ কোটির বেশি তবে ২০ কোটির কম হলে এক শতাংশ, ২০ কোটির বেশি কিন্তু ৫০ কোটির কম হলে এক দশমিক ৫০ শতাংশ ও ৫০ কোটির বেশি হলে দুই শতাংশ ‘সম্পদ কর’ নির্ধারণের পরিকল্পনা করছে এনবিআর। এই সম্পদ কর কোনোভাবেই করদাতার প্রদেয় করের চেয়ে বেশি হবে না।
রপ্তানি বাড়াতে বহু বছর ধরেই প্রণোদনা দিয়ে আসছে সরকার। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়া, পাট, কৃষিপণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রণোদনার বিপরীতে ১০ শতাংশ উৎস কর কেটে নেওয়া হয়। আগামী বাজেটে এটি দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা করছে সরকার।
ব্যাংকে জমা টাকার ওপর আবগারি শুল্কের স্তর ও হারে ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে। তবে এতে সুবিধা পাবেন নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। আগে তিন লাখ টাকার বেশি রাখলে আবগারি শুল্ক কেটে নেওয়া হতো। এটি বাড়িয়ে পাঁচ লাখ টাকা করা হয়েছে। পাঁচ লাখ টাকার বেশি রাখলে ৫০০ টাকা আবগারি শুল্ক দিতে হবে। এ ছাড়া দামি বৈদ্যুতিক প্রাইভেট কার ছাড়া সব ধরনের বৈদ্যুতিক প্রাইভেট গাড়ির কর কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, এবার ঢালাওভাবে কর ছাড় দেওয়া হবে না। তবে ব্যবসা-বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য কিছু ক্ষেত্রে কর ছাড় দেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যবসা খাত অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে কী ভূমিকা রাখছে তা বিবেচনায় নেওয়া হবে।