• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩৭ অপরাহ্ন
Headline
সরকারি বেতন দিতে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে সরকার এতিমখানার ইলিশ ভাগাভাগি করে নিলেন মাদ্রাসাশিক্ষকসহ দুজন, জরিমানা ৮০ হাজার ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্য  সরকার-বিএনপি গ্রহণ করেনি সৌদি আরবের তেল শোধনাগারে হামলা, বিশ্ববাজারে বাড়ল তেলের দাম সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের জন্য ঢাকা-টোকিও সম্পর্ক সুদৃঢ় করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর এইচএসসির ফল প্রকাশ শনিবার, জানা যাবে যেভাবে সিপিবির কার্যালয়ে হামলার প্রতিবাদে যুক্তফ্রন্টের বিক্ষোভ আজকের নামাজের সময়সূচি (২৮ অক্টোবর) স্থলভাগে প্রবেশ করেছে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’, উপকূলে তাণ্ডবের শঙ্কা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না নেতানিয়াহু বা বিরোধী জোট, রেকর্ড সংখ্যক আসন পাচ্ছে আরব দলগুলো

হৃদয়ের স্পন্দনে এক এশিয়া সংস্কৃতি, প্রযুক্তি, ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে এশিয়ান গেমসের আনন্দময় উদ্বোধন

বর্তমান বাংলাদেশ ডেস্ক / ৩২ Time View
Update : রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

  • তখন সন্ধ্যার আলো ফুরিয়ে আসছিল নাগোয়ার আকাশে। পালোমা মিজুহো স্টেডিয়ামের আলো একে একে জ্বলে উঠতেই মঞ্চের পাশে বসে মনে হচ্ছিল সামনে কোনো সাধারণ ক্রীড়ানুষ্ঠানের পর্দা উঠছে না, বরং আলো-সুর-ছন্দে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে পুরো এশিয়া। চারপাশে হাজারো দর্শকের চোখ স্থির হয়ে ছিল মাঠের মাঝখানের বিশাল হৃদয়াকৃতির মঞ্চে। মুহূর্তের মধ্যেই সুরের ঢেউ উঠল, আলো ছুটে গেল মঞ্চ থেকে গ্যালারির দিকে, আর নৃত্যের ছন্দে যেন স্পন্দিত হয়ে উঠল সেই বিশাল হৃদয়।

৪৫ দেশের কণ্ঠ, সংস্কৃতি আর স্বপ্ন তখন একই ছন্দে বাঁধা পড়ছে। নাগোয়ায় এভাবেই পর্দা উঠল এশিয়ান গেমসের ২০তম আসরের। ‘হারমনিক হার্ট বিট’, অর্থাৎ হৃদয়ের সুরেলা স্পন্দন ছিল পুরো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মূল ভাবনা। জাপানের ঐতিহ্য, আধুনিক প্রযুক্তি, প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং এশিয়ার বহুমাত্রিক সংস্কৃতিকে এক সুতোয় গেঁথে সেই ভাবনাকেই দৃশ্যমান করে তুলল আয়োজকরা।

মঞ্চের পাশে একেবারে প্রথম সারিতে বসে পুরো আয়োজনটি দেখতে দেখতে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে জাপানের প্রযুক্তির সঙ্গে প্রকৃতির অপূর্ব মেলবন্ধন। আধুনিক আলোকসজ্জা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভবিষ্যতের যান কিংবা বিশাল ডিজিটাল প্রক্ষেপণের মাঝেও কোথাও হারিয়ে যায়নি জাপানের প্রকৃতি, ঐতিহ্য এবং মানুষের সহজ সৌন্দর্য। বরং প্রযুক্তি এখানে প্রকৃতিকে আড়াল করেনি, নতুন এক ভাষায় তাকে আরো দৃশ্যমান করে তুলেছে।

জাপানে এশিয়ান গেমস ফিরল ৩২ বছর পর। ১৯৫৮ সালে টোকিও এবং ১৯৯৪ সালে হিরোশিমার পর এবার তৃতীয়বারের মতো এই মহাদেশীয় ক্রীড়া আসরের আয়োজক দেশ জাপান। আর সেই প্রত্যাবর্তনের মঞ্চ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে সংস্কার করা পালোমা মিজুহো স্টেডিয়ামকে। প্রায় ৩০ হাজার স্থায়ী আসনের এই স্টেডিয়ামে উদ্বোধনের জন্য আরো অস্থায়ী আসন যোগ করা হয়েছিল।

বাংলাদেশ সময় বিকাল ৪টায় আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও তার আগেই স্টেডিয়াম এলাকায় তৈরি হয়েছিল উৎসবের আবহ। দর্শকদের জন্য ‘ওয়ার্ম-আপ স্টেজ’-এ চলছিল নানা আয়োজন। নাগোয়ার আকাশও যেন সে উৎসবের অংশ হয়ে উঠেছিল। জাপানের বিমান বাহিনীর বিখ্যাত ‘ব্লু ইমপালস’ আকাশে উড়ন্ত বিমানের রেখায় বিশাল হৃদয়ের আকৃতি তৈরি করে। নিচে বসে সেই দৃশ্য দেখার সময় মনে হচ্ছিল হৃদয়ের যে প্রতীক একটু পর মঞ্চে দেখা যাবে, তার প্রথম রেখাটি যেন আকাশেই এঁকে দেওয়া হয়েছে।

স্টেডিয়ামের ভেতরের মূল মঞ্চটিও ছিল বিশাল হৃদয়ের আদলে তৈরি। শুরুতেই জাপানের জনপ্রিয় বেহালাবাদক ও সুরকার তারো হাকাসে সেই মঞ্চে উঠে বেহালায় সুর তোলেন। তার সুরের সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চজুড়ে শুরু হয় নৃত্যের আয়োজন। নাগোয়া ও আইচির বিভিন্ন এলাকার ২৪০ স্থানীয় নৃত্যশিল্পী চারটি আলাদা দলের মতো করে মঞ্চে প্রবেশ করেন।

কখনো তারা একসঙ্গে জড়ো হয়েছেন, কখনো আবার ছড়িয়ে পড়েছেন পুরো মঞ্চজুড়ে। মানুষের জীবন, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং একে অন্যের সঙ্গে সংযোগের প্রতীকী এ পরিবেশনা ধীরে ধীরে রূপ নেয় এক বিশাল ‘ওয়েলকাম’ বার্তায়। এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অতিথিদের যেন নিজেদের ঘরের মানুষ হিসেবেই স্বাগত জানাল নাগোয়া।

এরপর আসে স্বাগতিক জাপানের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পর্ব। জাপানের আত্মরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন, আর সংগীতশিল্পী কেইকো তোদা পরিবেশন করেন জাপানের জাতীয় সংগীত। আনুষ্ঠানিকতার এ পর্ব শেষ হতেই অপেক্ষা শুরু হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্যটির জন্যÑক্রীড়াবিদদের বর্ণিল পদযাত্রা।

ইংরেজি বর্ণমালার ক্রম অনুসারে একে একে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদল। মাঠের চারপাশে তখন পতাকার রঙ বদলাচ্ছে মুহূর্তে মুহূর্তে, আর গ্যালারির চোখও ছুটছে এক দল থেকে অন্য দলের দিকে। বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদদের প্রবেশের মুহূর্তটিও ছিল আনন্দের। দেশের পতাকা হাতে সামনে ছিলেন শুটার আবদুল্লাহ হিল বাকি ও কারাতেকা হুমাইরা আক্তার অন্তরা।

পদযাত্রায় প্রতিটি দলের সঙ্গে যেন আলাদা আলাদা গল্প ঢুকছিল মাঠে। কোরিয়া, চীন, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ একের পর এক দেশের ক্রীড়াবিদরা যখন মাঠে প্রবেশ করছিলেন, তখন গ্যালারিতে তৈরি হচ্ছিল উৎসবের আবহ। তবে আয়োজকদের প্রত্যাশার তুলনায় দর্শকদের উচ্ছ্বাস কিছুটা সংযতই মনে হয়েছে। স্টেডিয়ামের কিছু অংশে আসন ফাঁকা ছিল, আর পুরো গ্যালারির শব্দও বড় কোনো আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরের উদ্বোধনের তুলনায় ছিল কিছুটা মৃদু।

তবে মঞ্চের গল্পে কোনো বিরতি ছিল না। পদযাত্রার মধ্যেই ফুটে উঠতে থাকে নাগোয়া ও আইচির ইতিহাস। বিশাল বেলুন কাঠামোয় উঠে আসে নাগোয়া দুর্গের অবয়ব। জাপানি কাবুকি শিল্পীরা পরিবেশন করেন ঐতিহ্যবাহী সিংহ নৃত্য। শতবছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে একই মঞ্চে জায়গা করে নেয় আধুনিক প্রযুক্তি।

একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্মিত গায়কের উপস্থিতিও ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম চমক। বাস্তব শিল্পী, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং মঞ্চের আলোকচ্ছটার সমন্বয়ে তৈরি হয় এমন এক দৃশ্য, যেখানে পুরোনো জাপান আর ভবিষ্যতের জাপানকে আলাদা করে দেখা কঠিন হয়ে পড়ে।

এরপর অনুষ্ঠানে উঠে আসে আইচি-নাগোয়ার শিল্প ও প্রযুক্তির শক্তি। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে শিল্পীদের পরিবেশনার সঙ্গে মঞ্চে হাজির হয় ভবিষ্যৎধর্মী যান ও প্রযুক্তির নানা প্রদর্শনী। আইচি প্রিফেকচারে টয়োটার মতো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর। সেই শিল্প-ঐতিহ্যের ছাপও ছিল অনুষ্ঠানের এই অংশে। টোকিও অলিম্পিকে ব্যবহৃত টয়োটার দ্রুতগামী বিশেষ যান যখন মঞ্চে হাজির হলো, তখন প্রযুক্তির সেই প্রদর্শনী পেয়ে গেল আলাদা মাত্রা।

সবকিছুর মাঝেও জাপানের প্রকৃতিকে ভুলে যায়নি আয়োজন। আলো, শব্দ, চলমান মঞ্চ এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গ এমনভাবে মিশে ছিল, যেন প্রযুক্তি আর প্রকৃতি এখানে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একই গল্পের দুই চরিত্র। এই মেলবন্ধনই হয়তো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটিকে কেবল জাঁকজমক না রেখে আনন্দময় করে তুলেছে।

এরপর আসে আনুষ্ঠানিক প্রোটোকলের গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির সভাপতি কার্স্টি কভেন্ট্রি, অলিম্পিক কাউন্সিল অব এশিয়ার সভাপতি শেখ জোয়ান বিন হামাদ আল থানি, জাপানের সম্রাট নারুহিতো ও সম্রাজ্ঞী মাসাকোসহ বিশিষ্ট অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন। ওসিএ সভাপতির বক্তব্যে উঠে আসে এশিয়ার মানুষের একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা। এরপর জাপানের সম্রাট নারুহিতো আনুষ্ঠানিকভাবে ২০তম এশিয়ান গেমস উদ্বোধনের ঘোষণা দেন।

কিন্তু পুরো আয়োজনের আবেগ তখনো বাকি। ২২ আগস্ট নাগোয়ায় শুরু হওয়া মশালযাত্রা ৪০টি পৌরসভা ও নাগোয়ার ১৬টি ওয়ার্ড ঘুরে শেষ পর্যন্ত এসে পৌঁছায় মিজুহো স্টেডিয়ামে। সাতজন মশালবাহকের শেষজন হিসেবে মাঠে প্রবেশ করেন জাপানের কিংবদন্তি হ্যামার থ্রোয়ার শিগেনোবু মুরোফুশি।

তারপর ঘটে সেই দৃশ্য, যার জন্য হয়তো এতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিল পুরো স্টেডিয়াম। বাবার পাশে এসে দাঁড়ান তার ছেলে কোজি মুরোফুশি, যিনি ২০০৪ সালের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন। পাঁচবারের এশিয়ান গেমস চ্যাম্পিয়ন বাবা এবং অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন ছেলে একসঙ্গে মশাল ধরলেন। দুই প্রজন্মের দুই চ্যাম্পিয়নের হাতে যখন জ্বলে উঠল এশিয়ান গেমসের মূল আগুন, তখন ‘হারমনিক হার্ট বিট’-এর অর্থ যেন চোখের সামনে আরো পরিষ্কার হয়ে উঠল।

সেই আগুন কেবল একটি ক্রীড়া আসরের আনুষ্ঠানিক শিখা নয়, বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়া খেলাধুলার ভালোবাসারও প্রতীক হয়ে উঠল। সীমান্ত আলাদা হতে পারে, ভাষা আলাদা হতে পারে, সংস্কৃতির রঙও আলাদা হতে পারে; কিন্তু খেলাধুলার হৃদস্পন্দন যে একই, বাবা-ছেলের সেই যৌথ মুহূর্ত যেন সেটিই বলে গেল।

আগুন জ্বলার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণতা পেল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মূল বার্তা। বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও সীমান্তের পার্থক্য পেরিয়ে খেলাধুলা মানুষকে এক করার শক্তি রাখেÑআয়োজকদের বক্তব্যে বারবার ফিরে এসেছে এ বিশ্বাস। এরপর আতশবাজির ঝলকানি ছড়িয়ে পড়ল নাগোয়ার রাতের আকাশে। প্রায় দুই ঘণ্টার আয়োজন শেষ হলো আলো, শব্দ আর আনন্দের একসঙ্গে মিশে যাওয়া দৃশ্যে।

পর্দা উঠেছে, এখন শুরু আসল লড়াই। পদক জয়ের লড়াই। ৪৫টি জাতীয় অলিম্পিক কমিটির প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন এই আসরে, যেখানে প্রায় ১১ হাজার ক্রীড়াবিদ ৪৩টি খেলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ক্রিকেট, ফুটবল, হকি, বাস্কেটবলসহ কয়েকটি প্রতিযোগিতা অবশ্য এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। ৪ অক্টোবর পর্যন্ত নাগোয়া ও আইচির বিভিন্ন ভেন্যুতে চলবে এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসবটি।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মঞ্চে যে বিশাল হৃদয়টি আলোয় জ্বলছিল, এখন তার স্পন্দন ছড়িয়ে পড়বে প্রতিটি ভেন্যু, ট্র্যাক, পুল ও কোর্টে। সেখানে থাকবে পদকের লড়াই, থাকবে জয়-পরাজয়ের হিসাব, থাকবে কারো চোখের জল আর কারো উল্লাস। কিন্তু মিজুহো স্টেডিয়ামের মঞ্চের পাশে বসে উদ্বোধনের পুরো আয়োজন দেখে মনে হলো পদকের হিসাবের বাইরেও গেমসের আরো একটি বড় গল্প আছে।

সে গল্পে প্রযুক্তির সঙ্গে প্রকৃতি পাশাপাশি হাঁটে, ঐতিহ্যের সঙ্গে ভবিষ্যৎ হাত মেলায়, আর ভিন্ন দেশের মানুষ একই হৃদয় স্পন্দনে এক মুহূর্তের জন্য হলেও এক হয়ে যায়। নাগোয়ার রাতের আকাশে আতশবাজি নিভে গেছে; কিন্তু সেই হৃদয়ের আলো এখন ছড়িয়ে পড়বে মাঠে মাঠে।

খেলার সত্যিকারের আনন্দ তো শেষ পর্যন্ত ওটাই!


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category