• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৫ পূর্বাহ্ন
Headline
প্রাথমিকে ৯৩, মাধ্যমিকের ৫৭ শতাংশ বই ছাপা শেষ, নভেম্বরে শতভাগ সরবরাহের লক্ষ্য ৪ বছরে ২ কোটি ৪০ লাখ কৃষক কার্ড দেবে সরকার ইউপি নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘনে প্রার্থিতা বাতিল, সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড জাপানে টয়োটার মোতোমাচি কারখানা পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী ডিএফওর বিরুদ্ধে অর্থ ছাড় না দেওয়ার অভিযোগ, পাঁচ মাস ধরে ভাতা বন্ধ লাউয়াছড়ার কর্মীদের তুরাগ নদ থেকে বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার অস্তিত্ব হারানোর পথে আড়িয়াল খাঁ, ময়নাকাটা বিশ্ববাজারে আবার কমল জ্বালানি তেলের দাম বিদায়ের ক্ষণ গুনছেন নেতানিয়াহু নওগাঁর নিয়ামতপুরে আরডিআরএস বাংলাদেশের উদ্যোগে সাড়ে ৭ হাজার গাছের চারা বিতরণ

সাংবাদিক দেবাশীষ দম্পতির পরিবারের চার সদস্যের সৎকার-দাফন সম্পন্ন

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি / ৪২ Time View
Update : রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬

দেবাশীষ দম্পতির পরিবারের চার সদস্যের সৎকার-দাফন সম্পন্ন

কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী আফসানা শারমীন, শিশুপুত্র স্বর্ণশীষ দত্ত ও শ্বশুর আকরাম হোসেনের সৎকার ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে। মৃত্যুর প্রায় ৯১ ঘণ্টা পর শনিবার রাতে তাঁদের মরদেহ কুষ্টিয়ায় পৌঁছানোর পর পরিবারের সদস্য, স্বজন, সহকর্মী সাংবাদিক ও স্থানীয়দের উপস্থিতিতে শেষ বিদায় জানানো হয়।

শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে চারজনের মরদেহ কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়া বাহাদুর আলী বিশ্বাস সড়কের বাসায় পৌঁছায়। মরদেহ পৌঁছানোর খবর পেয়ে মুহূর্তেই বাড়িতে ভিড় করেন স্বজন, প্রতিবেশী, সাংবাদিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। একই পরিবারের চার সদস্যের নিথর দেহ একসঙ্গে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। শোকের আবহ নেমে আসে পুরো এলাকায়।

পরে পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পৃথক ধর্মীয় রীতিতে তাঁদের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত ও তাঁর তিন বছর বয়সী শিশুপুত্র স্বর্ণশীষ দত্তের মরদেহ কুষ্টিয়া কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানে হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সৎকার করা হয়।

অন্যদিকে দেবাশীষের স্ত্রী আফসানা শারমীন ও তাঁর বাবা আকরাম হোসেনের জানাজা কুষ্টিয়ার কুঠিপাড়ায় অবস্থিত উপজেলা মডেল মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় শত শত মানুষ অংশ নেন। পরে তাঁদের মরদেহ কুষ্টিয়া পৌর গোরস্থানে দাফন করা হয়।

‘বাবা-মা খেলনা নিয়ে ফিরবে’, অপেক্ষায় ছিল ছোট্ট পাখি

এই মর্মান্তিক ঘটনায় সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য ছিল সাংবাদিক দম্পতির একমাত্র কন্যা পাখির কান্না। বাবা-মা, ছোট ভাই ও নানুর মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে শিশুটি।

কয়েক দিন ধরে বাবা-মায়ের দেশে ফেরার অপেক্ষায় ছিল পাখি। তার ধারণা ছিল, বাবা-মা বিদেশ থেকে তার জন্য খেলনা, চকলেট ও নতুন জামাকাপড় নিয়ে ফিরবেন। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান হয় চারটি নিথর দেহ ফিরে আসার মধ্য দিয়ে।

কলকাতার আগুনে মরদেহগুলোর অবস্থা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে স্বজনদের অনেকেই শেষবারের মতো তাঁদের মুখ দেখার সুযোগও পাননি। প্রিয়জন হারানোর বেদনার সঙ্গে এই বাস্তবতা স্বজনদের শোককে আরও ভারী করে তুলেছে।

সহকর্মী সাংবাদিকদের চোখে অশ্রু

দেবাশীষ দত্তের শেষ বিদায়ে কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন। সহকর্মী সাংবাদিকদের অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। কেউ সান্ত্বনা দেন পরিবারের সদস্যদের, কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন প্রিয় সহকর্মীর নিথর দেহের পাশে।

সহকর্মীদের ভাষ্য, দেবাশীষ ছিলেন সদালাপী, হাসিখুশি ও দায়িত্বশীল সাংবাদিক। স্থানীয় মানুষের সমস্যা, নাগরিক দুর্ভোগ এবং জনস্বার্থের নানা বিষয় সংবাদে তুলে ধরতে তিনি সক্রিয় ছিলেন। তাঁর এমন আকস্মিক মৃত্যু কুষ্টিয়ার গণমাধ্যম অঙ্গনে গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে।

শনিবার সকালে কুষ্টিয়ার একদল সাংবাদিক যশোরের বেনাপোল সীমান্তে গিয়ে সহকর্মী দেবাশীষ দত্ত ও তাঁর পরিবারের মরদেহ গ্রহণ করেন। দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়।

পরিবারের পাশে জেলা প্রশাসন

নিহতদের শেষকৃত্য ও দাফনের সময় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পরিবারের পাশে দাঁড়ানো হয়। কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হারুন অর রশিদ নিহত চারজনের সৎকার ও দাফনের জন্য জনপ্রতি ২৫ হাজার টাকা করে মোট ১ লাখ টাকা পরিবারের সদস্যদের হাতে তুলে দেন।

চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে আর ফেরা হলো না

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ৩ আগস্ট স্ত্রী আফসানা শারমীন ও সন্তানদের নিয়ে ভারতের বেঙ্গালুরুতে যান সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত। সেখানে নারায়ণা হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তাঁরা।

অন্যদিকে দেবাশীষের শ্বশুর আকরাম হোসেনও ছোট জামাই ফিরোজের চিকিৎসার জন্য ৫ আগস্ট বেঙ্গালুরু যান। চিকিৎসা শেষে ফিরোজ ১৬ আগস্ট বাংলাদেশে ফিরে এলেও আকরাম হোসেন মেয়ের পরিবারটির সঙ্গে থেকে যান।

চিকিৎসা শেষে দেবাশীষ, তাঁর স্ত্রী, সন্তান ও শ্বশুর ১৮ আগস্ট মঙ্গলবার বিমানযোগে বেঙ্গালুরু থেকে কলকাতায় পৌঁছান। সেদিন রাতে তাঁরা মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই আবাসিক হোটেলে ওঠেন। পরদিন ১৯ আগস্ট তাঁদের বাংলাদেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু দেশে ফেরার আগেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড তাঁদের জীবন কেড়ে নেয়।

চারজনের মৃত্যুর ঘটনায় কলকাতায় তদন্ত

কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই আবাসিক হোটেলে আগুন লাগার পর ভবনের ভেতরে ব্যাপক ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। আগুন ও ধোঁয়ার কারণে বেশ কয়েকজন আটকা পড়েন। উদ্ধারকারী দল অভিযান চালিয়ে অনেককে বের করে আনলেও দেবাশীষ দত্তের পরিবারসহ কয়েকজনের মৃত্যু হয়।

ঘটনার পর অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও ভবনটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। ভবনের নিরাপত্তাব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন পথ এবং অগ্নিনিরাপত্তা বিধি যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ভালোবাসার বিয়ের পর দুই ধর্মের রীতিতে সংসার

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় নয় বছর আগে পরিবারের মতের বাইরে দেবাশীষ দত্ত ও আফসানা শারমীনের বিয়ে হয়। ভিন্ন ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাঁদের বিয়ে নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে শুরুতে বিরোধ তৈরি হয়েছিল।

আফসানা শারমীনের বাবা আকরাম হোসেন মেয়েকে নিজের কাছে ফিরিয়ে নিতে আদালতেরও শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তবে শারমীন দেবাশীষের সঙ্গে সংসার করার সিদ্ধান্তে অটল থাকায় তাঁকে আর ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

পরবর্তী সময়ে তাঁরা নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও রীতিনীতি বজায় রেখেই সংসার করছিলেন। তাঁদের দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে মর্মান্তিক পরিণতি হলো, কলকাতার সেই অগ্নিকাণ্ডে একই সঙ্গে স্বামী-স্ত্রী, তাঁদের শিশুসন্তান এবং শ্বশুরের মৃত্যু।

সাংবাদিকতা ও কর্মজীবন

নিহত দেবাশীষ দত্ত কুষ্টিয়ার গণমাধ্যম অঙ্গনে পরিচিত মুখ ছিলেন। তিনি দৈনিক আজকের পত্রিকা ও চ্যানেল নাইনের কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজকের আলো পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

কর্মজীবনে তিনি স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যা, মানুষের দুর্ভোগ, অনিয়ম ও জনস্বার্থের বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশে সক্রিয় ছিলেন। সহকর্মীদের কাছে তাঁর পরিচিতি ছিল সাহসী, দায়িত্বশীল ও সদাহাস্যোজ্জ্বল সাংবাদিক হিসেবে।

দেবাশীষের শ্বশুর আকরাম হোসেন কুষ্টিয়া ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো)-এর কর্মচারী ছিলেন। ২০২০ সালে তিনি চাকরি থেকে অবসর নেন।

একসঙ্গে একটি পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যুতে কুষ্টিয়ায় এখনো শোকের আবহ বিরাজ করছে। স্বজনদের বুকফাটা কান্না, সহকর্মীদের অশ্রুসিক্ত চোখ আর ছোট্ট পাখির নির্বাক অপেক্ষা যেন কলকাতার সেই ভয়াবহ রাতের নির্মমতার কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। চিকিৎসা শেষে হাসিমুখে দেশে ফেরার কথা ছিল তাঁদের, কিন্তু ফিরেছেন চারটি নিথর দেহ হয়ে। এই শোক কুষ্টিয়ার মানুষের কাছে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category