স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মোহাম্মদ কামরুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বদলি ও পদোন্নতিতে ঘুষ বাণিজ্য এবং ঠিকাদারি বিল আটকে কমিশন আদায়ের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ এরই মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ জমা পড়েছে।
এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার পর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মোঃ কামরুজ্জামান চৌধুরী বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ ১৭ বছর পদোন্নতি বঞ্চিত থাকার অজুহাতে তিনি অর্থলিপ্সায় উন্মুত্ত হয়ে পড়েছেন এবং মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে তোয়াক্কা না করে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করছেন বলে দাবি সমালোচকদের।
বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে—বিশেষ করে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ও ডা. আ ফ ম রুহুল হকের সময়ে—স্বাস্থ্য খাত ব্যাপক দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান গণতান্ত্রিক বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়েই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করে। তবে নাগরিক সমাজ ও পর্যবেক্ষণদের মতে, কতিপয় চুক্তিভিত্তিক আমলার বেপরোয়া দুর্নীতি এবং বিগত সরকারের সুবিধাভোগী ঠিকাদার ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে সরকারের এই নীতি চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
দেশে বর্তমানে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনা করছে। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। কিন্তু চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া কিছু আমলার কারণে সেটি বাধাগ্রস্থ হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন অনেকেই।
জানা গেছে, দুর্নীতির মাত্রা না কমে দ্বিগুন বেড়ে গেছে। আর এই সুযোগ নিচ্ছে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সুবিধাভোগী কিছু ঠিকাদার ও ব্যবসায়ী মহল। স্বাস্থ্য সচিব মো: কামরুজ্জামানকে এক বছরের চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার পর তিনি বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তার বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ,দুর্নীতি ও বিজনেস অব রুলস ভাঙার কথা চালাচালি হচ্ছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত পৌছে গেছে।
অভিযোগ সুত্রে জানাগেছে, জুলাই আন্দোলন দমনে গুলির নির্দেশদাতা তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুজিৎ দেবনাথ, স্নেহাশীষ ও খন্দকার রবিউল ইসলাম বর্তমানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কর্মরত। সচিবের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্থ এ তিন কর্মকর্তাকে গুরুদায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। উপসচিব সুজিৎ দেবনাথ ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের ক্যাডার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দমনে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োজিত ও গুলির নির্দেশদাতা ছিলেন। তাকে প্রশাসন শাখা-১ ও সচিবের গোপনীয় কাজ করে দেওয়ার জন্য বিকল্প পিএস হিসেবে রাখা হয়েছে। উপসচিব স্নেহাশিষ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে গুলির নির্দেশদাতা ছিলেন। তাকে স্বাস্থ্য-৪ শাখার দায়িত্ব দেওয়া আছে। সিনিয়র সহকারী সচিব খন্দকার রবিউল ইসলাম বিভিন্ন এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে জুলাই আন্দোলন দমনে গুলির নির্দেশদাতা ছিলেন। তাকে প্রশাসন-২ ও প্রশাসন-৪ শাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনজনের দায়িত্ব অতি গুরুত্বপূর্ণ। কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বন্টন করেন সচিব একক সিদ্ধান্তে। তিনি মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী কারও সাথে আলোচনা না করে একক সিদ্ধান্তে দায়িত্ব বন্টন করেন বলে জানা গেছে।
সচিব কামরুজ্জামান নিজেকে বিএনপিপন্থী, জুলাই সহযোদ্ধা ইত্যাদি স্লোগানে মুখরিত থাকলেও ফ্যাসিস্টের সহযোগি ও দুর্নীতিগ্রস্থ কর্মকর্তাদের গুরু দায়িত্বে রেখে তাদের দুর্বলতার সুযোগে তাদের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ফ্যাসিস্ট আমলে বগুড়ার ডিসি ও এলজিআরডি মন্ত্রী তাজুল ইসলামের পিএস, বাগেরহাট ও কক্সবাজারের ডিসি, রংপুর জেলার ডিসি এবং বিগত আওয়ামী সরকারের সময় প্রশাসনকে দলীয়করণে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন এমন কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রেখেছেন সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী। তিনি ফ্যাসিস্টের দোসর কর্মকর্তাদের নিরাপদ আশ্রয়দাতা হিসেবে পরিণত হয়েছেন।
ডেলিগেশন অব ফিন্যানসিয়াল পাওয়ার অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারাধীন কেনাকাটা/অর্থ পরিশোধের সকল নথি মন্ত্রী পর্যায়ে অনুমোদনের কথা থাকলেও কোনো কোনো নথি সচিব নিজেই অনুমোদন দিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, নথি আটকে রেখে চিকিৎসক বদলি, বিল অনুমোদনসহ অধিকাংশ ক্ষেত্রে মোটা অংকের লেনদেন করছেন। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ের ঠিকাদারদের কাজ দিয়ে বিপুল অর্থ আয় করছেন। লক্ষ্য একটায় এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে যা করার করে নেওয়া। ফলে মন্ত্রণালয়ের স্বচ্ছতা, গতিশীলতা, সংস্কার, জবাবদিহিতায় অনিশ্চয়তার পাশাপাশি সরকারের লক্ষমাত্রা অর্জন বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।
সব সরকারের আমলেই আফতাবের রাজত্ব:
স্বাস্থ্য সেক্টরে প্রভাবশালী এইচ টি এম এস নামে একটি কোম্পানি আছে। মালিকের নাম-আফতাব আহমেদ। বাড়ী-ফরিদপুর। ঢাকার অফিস-আবাহনী মাঠের পাশে। সময় পেলেই স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান যান আফতাবের অফিসে। আফতাব হচ্ছেন সচিবের অন্যতম ইনকামের মাধ্যম। সচিব হিসেবে যোগদানের প্রথম দিনেই আফতাবের নিকট থেকে ৩ কোটি টাকা সমমূল্যের ইউরো উপঢৌকন নিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে।
সরকার বদল হয়, মন্ত্রী বদল হয়, আফতাব ঠিক একই জায়গায় থাকে। কখনও মন্ত্রী রুহুল হক,কখনও নাসিম কখনও ডঃ জাহিদ মালেক তার গডফাদারের ভুমিকা পালন করেছে। কথিত আছে,স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যত সুন্দরী নারী অফিসার আসে প্রথমে ছোট ছোট গিফট দিয়ে শুরু করে সম্পর্ক গড়া। পরে বাড়ী গাড়ি পর্যন্ত গড়ায়। এবং অনেক মহিলা পুরুষ অফিসার এই আফতাবের কবজায় থাকে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন সারির কর্মকর্তা কর্মচারী সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করেন ঈদ, পূজা সারা মাস জুড়ে থাকে আর্থিক লেনদেন। সোরওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কাজ না করেই ১৮ কোটি টাকা ডাক্তার উত্তম বড়ূয়ার মাধ্যমে উঠিয়ে নেয় আফতাব আহমেদ। ততকালীন সময়ে বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় সংবাদ প্রচার হলে সেই সময়ে লাইসেন্স গুলো কালো তালিকা ভুক্ত হয়। বর্তমান সচিব মোঃ কামরুজ্জামান আছেন আফতাবের কবজায়। টাকা, নারী, গাড়ি কি নেই আফতাবের কাছে। সময় পেলেই যাচ্ছেন আফতাবের অফিসে। আফতাব হচ্ছে সচিবের একমাত্র আয় ইনকামের রাস্তা ।
চিকিৎসক বদলি ও পদোন্নতিতে বেপরোয়া ঘুষ:
চিকিৎসকদের বদলি ও পদোন্নতিতে ৫-১০ লাখ করে ঘুষ নেন। ক্ষেত্র বিশেষে ১০-২০ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকেন। বনিবনা না হলে ফাইল আটকে রাখেন। ঠিকাদারি বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে ২%-৫% কমিশন নিয়ে থাকেন। তিনি মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রীর সাথে কোনো প্রকার আলোচনা বা নথি প্রতিমন্ত্রী/মন্ত্রীর অনুমোদন ছাড়াই একক সিদ্ধান্তে কর্মকর্তাদের মধ্য দায়িত্ব বন্টন এবং ৮০-৯০% চিকিৎসক বদলি করেন। জনশ্রুতি আছে সচিব একাই মন্ত্রণালয় চালাচ্ছেন। এ সুযোগে আওয়ামী ফ্যাসিস্টের দোসর অফিসারগণকে মন্ত্রণালয় থেকে না সরিয়ে তাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রেখে তাদের মাধ্যমে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন।
বর্তমান সরকারের গতিশীলতা, স্বচ্ছতা ও সংস্কারের বিপরীতে হাটছেন স্বাস্থ্য সচিব মোঃ কামরুজ্জামান চৌধুরী। তার দফতরের নথি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০-৩০ দিন তার স্বাক্ষরের জন্য নথি পড়ে থাকছে। মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী নথিতে আলাপের জন্য। চিকিৎসকগণের বদলি ও পদোন্নতিতে ৫-১০ লাখ করে ঘুষ নেন। ক্ষেত্র বিশেষে ১০-২০ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকেন। বনিবনা না হলে ফাইল আটকে রাখেন। জনশ্রুতি আছে সিএমএসডি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারি বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে ২%-৫% কমিশন নিয়ে থাকেন। সচিবের কমিশন বাণিজ্য এখন ওপেন সিক্রেটে পরিণত হয়েছে। তার পিএস নাজমুস সাকিব মূল সহযোগি। সে গত মরকার আমলে লন্ডনে দুতাবাসে ১ম সেক্রেটারি ছিল যা ফ্যাসিস্ট এর সুবিধাভগি হিসাবে। তার দফতরের নথি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০-৩০ দিন বা কয়েক মাস তার স্বাক্ষরের জন্য নথি পড়ে থাকছে। মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী নথিতে আলাপের জন্য সচিবকে লিখলেও তিনি আলাপ না করে তাচ্ছিল্যের ন্যায় ফাইল ফেলে রাখেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দূর্নীতির আখড়া বানাতে এবং সকল ক্ষেত্রে পিছিয়ে রাখতে কামরুজ্জামান একাই যথেষ্ঠ।
এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য স্বাস্থ্য সচিবের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি কল রিসিভ করেন নি।