ঐতিহ্যগতভাবে অভিবাসনের বিষয়ে জাপান কঠোর ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হলেও কাজের প্রয়োজনে দেশটি এখন অনেকটাই বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে ভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা ও ধর্মের মানুষের আগমন ঘটছে দেশটিতে। ফুজিসাওয়ার মতো জনপদগুলোতে চলা এই বিতর্কটি মূলত জাপানিদের আত্মপরিচয়ের গভীরে আঘাত হানছে। ইজুমিজাওয়ার মতে, আমেরিকা ও ইউরোপের মেরুকরণমূলক অভিবাসন বিতর্কও তাদের মনে এই অস্বস্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে স্থানীয় রেলওয়ে স্টেশনের সামনে মসজিদ নির্মাণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে এই প্রস্তাবিত নির্মাণের প্রতিবাদ জানায়। কেউ কেউ যুক্তি দেখান যে, কাছাকাছি অবস্থিত প্রাচীন শিন্তো মন্দিরের তুলনায় বিশাল আকৃতির মসজিদ নির্মাণ ঐতিহ্যের প্রতি এক ধরনের অসম্মান। পাশাপাশি জাপানি সোশ্যাল মিডিয়ায় নানামুখী ভুল তথ্য ও ঘৃণা ছড়ানোর অভিযোগও উঠছে। বেশ কিছু মসজিদ অবমাননাকর ফোন কল ও ইমেলের মুখোমুখি হয়েছে, যার প্রতিবাদে বর্ণবাদবিরোধী গ্রুপগুলো পাল্টা সমাবেশ করেছে।
অবশ্য ভিন্ন সুরও শোনা যাচ্ছে শহরের বাসিন্দাদের কণ্ঠে। মসজিদ নির্মাণের নির্ধারিত সাইটের ঠিক বিপরীত দিকের একটি কফি শপের ব্যবস্থাপক হিরোকি সুজুকা পারস্পরিক বোঝাপড়া ও আলোচনার ওপর জোর দিয়ে বলেন, আমি এর সম্পূর্ণ বিরোধীও নই, আবার প্রবল সমর্থকও নই। আমার মতে প্রথম কাজ হলো তাদের সম্পর্কে জানা, ইসলাম ধর্ম ও তাদের মূল্যবোধ সম্পর্কে ধারণা নেওয়া। খোলামেলা মন এবং একে অপরকে বোঝার ইচ্ছাই এর চাবিকাঠি।
জাপানে মুসলমান হিসেবে জীবন কাটানোর অভিজ্ঞতাও বেশ বৈচিত্র্যময়। প্রায় ৩৯ বছর আগে শ্রীলঙ্কা থেকে ওসাকায় পাড়ি জমান ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মহিদিন। তখন বর্তমানের তুলনায় বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা ছিল অনেক কম। তবে মহিদিনের অনুভূতি হলো, আগের তুলনায় স্থানীয় মানুষ এখন অনেক বেশি প্রতিকূল হয়ে উঠেছে এবং অনলাইনে কিংবা সরাসরি মুসলমানদের লক্ষ্য করে কটু মন্তব্য ছুড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাপান ছেড়ে চলে যাওয়ার মতো অবমাননাকর মন্তব্যের পাশাপাশি মসজিদে এসে চিৎকার করে গালিগালাজ করার ঘটনাও ঘটছে।
তারপরও ওসাকার স্থানীয় মসজিদে নিয়মিত যাতায়াতকারী মহিদিন কখনো নিজের জীবন হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করেন না। দীর্ঘদিনের ভালো সম্পর্কের পরও সাম্প্রতিক সময়ে এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন তার চোখে পড়েছে। তবে এর পেছনে উভয় পক্ষেরই কিছু দায় রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, এতদিন তারা কেবল কাজের পেছনেই ছুটেছেন এবং স্থানীয় সমাজে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে বা একীভূত হতে যথেষ্ট প্রচেষ্টা চালাননি। ভবিষ্যতে সংলাপ বৃদ্ধি ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানোর ওপর তিনি জোর দিতে চান।
অন্যদিকে সাইতামা প্রিফেকচারের ইয়াসিও মসজিদের প্রতিনিধি শাকিল মোহাম্মদ গত এক দশক ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। পাকিস্তান থেকে জাপানে আসার পর প্রায় ২৬ বছর ধরে তিনি নির্মাণ খাতের সুপারভাইজর হিসেবে কাজ করেছেন এবং সাবলীল জাপানি ভাষায় কথা বলতে পারেন। তিনি মনে করেন, জাপানের নিয়মকানুন কঠোরভাবে মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। নিয়মমাফিক আবর্জনা ফেলা, পার্কিং আইন মানা কিংবা বাইক চালানোর সময় হেলমেট ব্যবহার করার মতো সাধারণ শিষ্টাচার বজায় রাখা প্রতিটি অভিবাসীর দায়িত্ব।
জাপান যখন এক বিরাট জনমিতিক পরিবর্তনের মুখে দাঁড়িয়ে নিজেদের পরিচয় টিকিয়ে রাখার লড়াই চালাচ্ছে, তখন এই সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক হিরোফুমি তানাদার তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ জাপানে বিদেশি ও স্থানীয় মিলিয়ে মুসলিম জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজারে, যা ২০১৯ সালে ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার। একইসঙ্গে ২০২৩ সালে জাপানের সামগ্রিক বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা চার মিলিয়ন ছাড়িয়েছে, যার বিপরীতে দেশের নিজস্ব জনসংখ্যা প্রায় দশ লাখ কমেছে।
সরকারি কর্মকর্তারা ঐতিহাসিকভাবে জাপানকে অভিবাসী দেশ হিসেবে স্বীকার করতে নারাজ এবং তারা অপেক্ষাকৃত স্বল্পমেয়াদি ভিসার ওপর বেশি জোর দেন। তবে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বাধীন সরকার কঠোর রক্ষণশীল নীতি বজায় রেখে গত জুন মাসে প্রায় অর্ধশত বছর পর বিদেশি নাগরিকদের ভিসার ফি পাঁচগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তাছাড়া অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের দমনে ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস এজেন্সির জনবল বাড়ানোসহ বিদেশি বাসিন্দাদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে নতুন সীমানা নির্ধারণের পরিকল্পনা চলছে।
সূত্র: বিবিসি







