৯০৩ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি ও আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের মামলার পরও ড. মো. কবির আহাম্মদ বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর পদে বহাল থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ন্যাশনাল ব্যাংকে পর্যবেক্ষক থাকাকালে একটি ন্যাক্কারজনক ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় তাকেসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
ড. মো. কবির আহাম্মদ বাংলাদেশ ব্যাংকে ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে। আর ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় দুদক মামলা দায়ের করেছে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি। এখন কবির আহাম্মদ স্বপদে বহাল থাকলে মামলা প্রভাবিত হওয়ার শঙ্কা করছেন অনেকেই।
দুদকের দায়েরকৃত মামলায় বলা হয়েছে, নীতিমালা অনুসরণ না করে দ্রুত বোর্ড মেমো তৈরি করে ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদনের পর ধাপে ধাপে বিতরণের শর্ত উপেক্ষা করে মাত্র সাত দিনে ৫৯৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়। পরে ২০২০ সালের ৬ জানুয়ারি ও ৮ মার্চ আরও ৩৫ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে ৫২৫ কোটি টাকার ৩৭টি বেয়ারার চেকের মাধ্যমে নগদে উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ব্লুম সাকসেস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ জালাল খান মজলিশ ও পরিচালক খাদিজা আক্তার ন্যাশনাল ব্যাংকের দিলকুশা শাখায় হিসাব খোলেন। হিসাব খোলার দিনই বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি প্রকল্পের কাজের অজুহাতে তিন বছর মেয়াদি ওডি ঋণ হিসেবে ৬০০ কোটি টাকার আবেদন করেন। ঋণের পক্ষে ভূয়া সাব-কন্ট্রাক্ট অ্যাগ্রিমেন্ট দাখিল করা হয় বলে দুদকের তদন্তে উঠে এসেছে।
ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহাম্মদ, ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক পরিচালক রন হক সিকদার, পারভীন হক সিকদার ও মনোয়ারা সিকদার; ব্লুম সাকসেস ইন্টারন্যাশনালের আহমেদ জালাল খান মজলিশ ও খাদিজা আক্তার; ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও দিলকুশা শাখা ব্যবস্থাপক মো. হাবিবুর রহমান, সাবেক ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর আরীফ মো. শহীদুল হক, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী মোসতাক আহমেদ (সি এম আহমেদ), সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ ওয়াদুদ, সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কোম্পানি সেক্রেটারি এ এস এম বুলবুল, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আবু রাশেদ নওয়াব, পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেন, খলিলুর রহমান ও মাবরুর হোসেনসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুদকের উপপরিচালক জিএম আহসানুল কবীর।
যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই মাত্র ৪ কার্যদিবসের (৬ দিন) মধ্যে এই বিশাল অঙ্কের ঋণ আবেদন অনুমোদন করা হয়। ওই সময়ে ড. মো. কবির আহাম্মদ ন্যাশনাল ব্যাংকে পর্যবেক্ষক (অবজার্ভার) হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর ৪৯(১) উপধারা অনুযায়ী ন্যাশনাল ব্যাংকের আর্থিক সূচকের অবনতি ও সুশাসনের ঘাটতির কারণে তাকে পর্যবেক্ষক (অবজার্ভার) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।
যে বোর্ড সভায় ঋণ অনুমোদন করা হয় (ন্যাশনাল ব্যাংকের ৪৩৩তম বোর্ড সভা) তিনি পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী ঋণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় তার বিশেষজ্ঞ মতামত দেওয়া বা প্রয়োজনে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) দেওয়ার কথা থাকলেও, তিনি তা না করে সব নিয়ম উপেক্ষা করে দ্রুত ঋণ অনুমোদনে সহায়তা করেছেন বলে প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে দুদক।
অর্থাৎ রক্ষক না হয়ে, ভক্ষকের ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯ (বিশ্বাসভঙ্গ), ৪২০ (প্রতারণা), ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ (জালিয়াতি) ও ১০৯ ধারা, ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ধারা অনুযায়ী মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।
ঋণের পুরো অর্থ উত্তোলন ও আত্মসাৎ হয়ে যাওয়ার প্রায় এক মাস পর তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব অফ-সাইট সুপারভিশনে (ডিওএস) প্রতিবেদন জমা দেন। এখানেও তার গাফিলতি এবং আঁতাতের যোগসুত্র পান সংশ্লিষ্টরা। অথচ বোর্ডসভায় তার নোট অব ডিসেন্ট দেওয়ার কথা ছিল।
দুদকের দায়েরকৃত ওই জালিয়াতি মামলার তদন্ত চলমান। এখানে ব্যাংকের নানা রকম কাগজপত্র ও তথ্য প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চপদে বহাল থাকলে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ানোর শঙ্কা দেখছেন কেউ কেউ। তদন্তের স্বচ্ছতার স্বার্থে তাকে সরিয়ে দেওয়া দাবি তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুর্নীতি দমন কমিশনের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মো. তরিকুল ইসলাম বার্তা২৪.কমকে বলেন, মামলার অনুসন্ধান বা তদন্ত যে কোন পর্যায়েই অভিযুক্তের স্বপদে বহাল থাকতে কোন বাধা নেই। তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যদি মনে করেন, অভিযুক্ত স্বপদে বহাল থাকলে তার তদন্তে বিঘ্ন বা প্রভাবিত হতে পারে তবে তিনি কারন উল্লেখ করে তদন্তের যে কোন পর্যায়ে আদালতে অভিযুক্তের সাসপেন্ড চেয়ে আবেদন করতে পারেন।
বক্তব্য নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহাম্মদকে বিকাল ৫:৪৯ মিনিটে তার মোবাইল নাম্বারে ফোন দেওয়া হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে ফোনও ব্যাক করেননি।