ব্যক্তিগত মতামত বা পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে উঠে বিশ্বমঞ্চে সব সদস্যরাষ্ট্রের সমান প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি এ প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সাধারণ পরিষদের ৮৫তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে ৮১তম অধিবেশনের নবনির্বাচিত সভাপতি খলিলুর রহমান তার ভিশন স্টেটমেন্টের শুরুতেই বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার কথা উল্লেখ করেছেন। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট, আফ্রিকার বিভিন্ন সংঘাত, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাসের কারণে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা তিনি তুলে ধরেছেন।
তার প্রস্তাবিত প্রথম অগ্রাধিকার তাই ‘সাইলেন্স দ্য গানস, এমপ্লিফাই দ্য ভয়েসেজ’ অর্থাৎ, অস্ত্রের শব্দ থামিয়ে আলোচনার কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করা। এটি শুধু যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান নয়; বরং আন্তর্জাতিক আইন, কূটনীতি এবং আলোচনার মাধ্যমে বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানের একটি দর্শন।
তার মতে, পৃথিবী এখন এমন এক সময় পার করছে যখন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আস্থা কমছে, বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বিশ্বাস দুর্বল হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।
এই বাস্তবতায় তিনি একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছেন—সংঘাত নয়, সংলাপই হতে হবে সমাধানের পথ।
মঙ্গলবার (২ জুন) নির্বাচনে বিজয়ের পর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে দেওয়া বক্তব্যে নবনির্বাচিত সভাপতি খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমি অত্যন্ত বিনয় ও শ্রদ্ধার সঙ্গে এই গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেছি। আমি সাধারণ পরিষদকে আশ্বস্ত করতে চাই, আমি পক্ষপাতহীনভাবে সব সদস্যরাষ্ট্রের সভাপতি হিসেবে কাজ করব। আমার ব্যক্তিগত কোনো মতামতকে সভাপতির দায়িত্ব পালনে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে দেব না। যে কোনো মতপার্থক্যকে পাশে রেখে সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে অভিন্ন পথ খোঁজার চেষ্টা করব।’
সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস. কাকোরিসকে ৮ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে এক বছরের জন্য এ পদে নির্বাচিত হন তিনি। এর মধ্য দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি নির্বাচিত হলেন।
এর আগে ১৯৮৬ সালে সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও রাজনীতিবিদ হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। প্রায় চার দশক পর আবারও সেই মর্যাদাপূর্ণ পদে বসতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
এবারের নির্বাচনে মোট ১৯০টি ভোট পড়ে। এর মধ্যে খলিলুর রহমান পান ৯৯ ভোট, আর আন্দ্রেয়াস এস. কাকোরিস পান ৯১ ভোট।
নির্বাচনের আগে ব্রাজিল প্রকাশ্যে বাংলাদেশের প্রার্থিতাকে সমর্থন জানায়। পাশাপাশি ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার সদস্য রাষ্ট্রগুলোও বাংলাদেশের পক্ষে প্রচারণা চালানোর ঘোষণা দেয়। ফলে সংস্থাভুক্ত বহু দেশের সমর্থন খলিলুর রহমানের পক্ষে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এই বিজয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতি সদস্যরাষ্ট্রগুলোর আস্থা, গ্রহণযোগ্যতা এবং ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাবের প্রতিফলন।
অনেকের কাছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদটি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক দায়িত্ব মনে হলেও বাস্তবে এটি বিশ্বের বৃহত্তম বহুপাক্ষিক রাজনৈতিক মঞ্চের নেতৃত্ব দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত এই পরিষদের সভাপতির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বিভক্ত বিশ্বে সংলাপ ও ঐকমত্যের পথ তৈরি করা।
খলিলুর রহমানের ভিশন স্টেটমেন্টে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া বিষয়গুলোর একটি হলো টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জনের জন্য নির্ধারিত বহু লক্ষ্যই বর্তমানে পিছিয়ে আছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো ঋণসংকট, মূল্যস্ফীতি, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এবং জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে নতুন চাপে পড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে তিনি বলেছেন, উন্নয়নের প্রশ্নে কোনো দেশকে পিছনে ফেলে রাখা যাবে না।
তার ভাষায়, ‘নো ওয়ান লেফট বিহাইন্ড, নো কান্ট্রি লেফট আউট’। এখানে শুধু দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কথা নয়, বরং পুরো উন্নয়নশীল বিশ্বের কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি), স্থলবেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ এবং ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর বিশেষ চ্যালেঞ্জকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে এই দৃষ্টিভঙ্গির স্পষ্ট মিল রয়েছে।
খলিলুর রহমানের ভিশন স্টেটমেন্টের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জলবায়ু পরিবর্তন। তিনি জলবায়ু সংকটকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখেননি; বরং এটি উন্নয়ন, মানবিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন বলেও উল্লেখ করেছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনকে তিনি শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, বরং উন্নয়ন, মানবিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন হিসেবেও দেখেন। পৃথিবী রক্ষায় কার্যকর বৈশ্বিক উদ্যোগের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার যেসব দেশ, তাদের অনেকেই এ সংকটের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী।
জলবায়ু অর্থায়ন বৃদ্ধি, অভিযোজন সক্ষমতা জোরদার এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাও এ অবস্থানের পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হয়।
বিশ্বজুড়ে শরণার্থী, বাস্তুচ্যুত মানুষ এবং মানবিক সংকটের সংখ্যা বাড়ছে। যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, রাজনৈতিক সহিংসতা ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে কোটি কোটি মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
খলিলুর রহমান তার ভিশন স্টেটমেন্টে ‘রাইটস অ্যান্ড প্রটেকশন-ফ্রিডম ফ্রম ফিয়ার অ্যান্ড ওয়ান্ট’ শিরোনামে মানবাধিকার, মানবিক সুরক্ষা এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
এখানে তিনি এমন একটি বিশ্বব্যবস্থার কথা বলেছেন, যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে।
যদিও তিনি সরাসরি রোহিঙ্গা সংকটের কথা উল্লেখ করেননি, তবুও শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর প্রতি তার গুরুত্ব বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে একটি স্বাভাবিক সংযোগ তৈরি করে।
আগামী ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হতে যাওয়া ৮১তম অধিবেশনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ অধিবেশনে জাতিসংঘ সংস্কার, ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক উন্নয়ন কর্মসূচি এবং নতুন মহাসচিব নির্বাচনসহ বেশ কিছু স্পর্শকাতর বিষয় আলোচনায় আসবে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা ও উন্নয়ন বৈষম্যের মতো চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হবে।
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কেও তার অবস্থান স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, ডিজিটাল বৈষম্য নতুন ধরনের বৈশ্বিক বৈষম্য তৈরি করছে। তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি, যাতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সুফল উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ উভয়ই সমানভাবে পায়।
তার আরেকটি অগ্রাধিকার হলো আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও প্রতিনিধিত্বশীল জাতিসংঘ গঠন। বিশেষ করে ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠস্বরকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।
যদিও সাধারণ পরিষদের সভাপতির হাতে সরাসরি সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষমতা নেই, তবুও জাতিসংঘ সংস্কার নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনাকে এগিয়ে নিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।