সুরা মুলক শুধু আখেরাতের প্রস্তুতির কথাই বলে না, বরং দুনিয়ার জীবনের প্রকৃত অর্থও স্পষ্ট করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করেন- কে আমলের দিক থেকে উত্তম’ (সুরা মুলক : ২)। এখানে ‘উত্তম আমল’-এর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা বোঝায়- আল্লাহর কাছে শুধু পরিমাণ নয়, বরং আন্তরিকতা ও গুণগত মানই বেশি মূল্যবান। জীবন তাই কোনো খেলা নয়; এটি একটি পরীক্ষা, আর মৃত্যু সেই পরীক্ষার সমাপ্তি। এরপর আল্লাহ তার সৃষ্টির নিখুঁত সম্পর্কে বলেন, ‘তুমি রহমানের সৃষ্টিতে কোনো অসামঞ্জস্য দেখতে পাবে না, পুনরায় তাকাও, তোমার দৃষ্টি ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে ফিরে আসবে’ (সুরা মুলক : ৩-৪)। এই আয়াত আমাদের শেখায়, যিনি এই সুবিশাল মহাবিশ্বকে নির্ভুলভাবে পরিচালনা করেন, তাঁর সিদ্ধান্তেও কোনো ত্রুটি নেই। মানুষের জীবনের দুঃখ-কষ্ট ও বিলম্বও তাই তাঁর প্রজ্ঞার অংশ।
পাখির উড়ানোর উদাহরণ দিয়ে আল্লাহ তাওয়াক্কুলের শিক্ষা দেন- ‘তারা কি দেখে না তাদের ওপরে পাখিদের- রহমান ছাড়া কেউ তাদের ধরে রাখে না’ (সুরা মুলক: ১৯)। এই আয়াত মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যিনি পাখিকে আকাশে ধরে রাখেন, তিনিই মানুষের জীবনও নিয়ন্ত্রণ করেন। দুশ্চিন্তার মুহূর্তে এই উপলব্ধি ঈমানকে দৃঢ় করে। সুরার শেষ আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমাদের পানি ভূগর্ভে হারিয়ে যায়, তবে কে তোমাদের জন্য প্রবাহমান পানি নিয়ে আসবে?’ (সুরা মুলক : ৩০)। এটি মানুষকে তার সীমাবদ্ধতা বুঝতে শেখায়। প্রযুক্তি ও ক্ষমতার গর্ব সত্ত্বেও জীবনের মৌলিক উপাদানগুলোর ওপর মানুষের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই; সবকিছুই আল্লাহর অনুগ্রহ।
নবীজি (সা.) আরও বলেছেন, এই সুরাটি তার পাঠকের জন্য সুপারিশ করতে থাকবে, যতক্ষণ না তাকে ক্ষমা করা হয়। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) একে ‘আল-মানিআহ’, অর্থাৎ কবরের আজাব থেকে রক্ষাকারী বলে অভিহিত করেছেন। যখন মানুষ কবরে একা থাকবে, তখন দুনিয়ার কোনো সম্পদ নয়, বরং আল্লাহর কালামই তার সহায় হবে। আজ মানুষ রাত জেগে অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় ব্যয় করে, অথচ কয়েক মিনিট সময় কুরআনের জন্য বের করতে চায় না। অথচ নিয়মিত সুরা মুলক তেলাওয়াত মানুষের ঈমান, চিন্তা ও আল্লাহর ওপর ভরসাকে শক্তিশালী করে এবং আখেরাতের জন্য এক অমূল্য সঞ্চয় হয়ে ওঠে। মনে রাখতে হবে, একদিন পৃথিবীর সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে; কিন্তু কুরআনের সঙ্গে সম্পর্কই হবে চিরস্থায়ী সঙ্গী।